যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন ‘ফাইলে’ ভারতের কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর নাম পাওয়া গেছে। এই ঘটনার পর দেশটির বিরোধী দলের নেতারা পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। খবর বিবিসির।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস সম্প্রতি ‘এপস্টেইন ফাইল’এর যে বড় সংখ্যক নথি প্রকাশ করেছে, সেখানেই হরদীপ পুরীর সঙ্গে জেফরি এপস্টেইনের ইমেইলের মাধ্যমে কথোপকথনের তথ্য রয়েছে।
এপস্টেইন ২০০৮ সালেই যৌন অপরাধী হিসাবে ঘোষিত হলেও হরদীপ সিং পুরী তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছিলেন ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে।
হরদীপ পুরী অবশ্য দাবি করেছেন যে এপস্টেইনের অপরাধমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক ছিল না। বিবিসি ‘এপস্টেইন ফাইল’ ঘেঁটে খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছে যে সেখানে আপত্তিজনক কী আছে? এরজন্য ‘এপস্টেইন ফাইল’এর নথিগুলি খুঁটিয়ে পড়া হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে এপস্টেইন ফাইল প্রকাশিত যেসব নথিতে হরদীপ সিং পুরীর উল্লেখ আছে, সেগুলির যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস প্রকাশিত মূল নথিগুলি হাইপারলিংক করে দেওয়া হয়েছে। রিড হফম্যান আমেরিকার একজন ইন্টারনেট শিল্পপতি এবং লিঙ্কডইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
জেফরি এপস্টেইন হরদীপ সিং পুরীকে একটি ইমেইলে লিখেছেন, “…আমি টের্জির সঙ্গে কথা বলেছি। রিড হফম্যান ভারতে আসার জন্য প্রস্তুত।”
জুন ২৩, ২০১৪
এপস্টেইনের ১৮ জুন তারিখের ইমেইলের জবাবে হরদীপ সিং পুরী লিখেছিলেন, “রিড হফম্যানের সফরের জন্য সহায়তা / সুবিধা করে দিতে পারলে আমি খুশি হব।”
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৪
রিড হফম্যান ও হরদীপ সিং পুরীকে একে অন্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একটি ইমেইলে এপস্টেইন লেখেন, রিড, হরদিপই ভারতে আপনার (সহায়তা করার) লোক।
সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৪
রিড হফম্যান ওই ইমেইলের জবাব দিয়েছিলেন পরের দিন, ২৫ সেপ্টেম্বর। তাতে তিনি লেখেন, হরদীপ, আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুবই ভালো লাগল। মানুষ বেছে নেওয়ার ব্যাপারে জেফরির পছন্দ খুবই ভাল (ব্যতিক্রম আমি)।
সেদিনই হরদীপ সিং পুরী হফম্যানের ওই ইমেইলের জবাব দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, জেফরি যে মানুষকে বুঝতে পারে, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তার ‘ইন্সটিঙ্কটস’ (মানুষকে চিনতে আর বুঝে নেয়ার ব্যাপারে) তো আরও ভাল।
অক্টোবর চার, ২০১৪
হরদীপ সিং পুরীকে ইমেইল করে জানতে চেয়েছিলেন, রিডের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে? হরদীপ পুরী সেদিনই জবাব দেন, আমি আজ দুপুরে একটি বৈঠকের জন্য এসএফে (সান ফ্রান্সিসকো) আছি। বন্ধু, আপনি সত্যিই কাজ করিয়ে নেন।
হরদীপ সিং পুরীর ইমেইলের জবাবে সেদিনই এপস্টেইন লিখেছিলেন, তাকে বলুন যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সামাজিক মাধ্যমের গুরুদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি তার ভারত যাত্রার বন্দোবস্ত করে দেবেন।
ভিসার ব্যবস্থা
অক্টোবর ১১, ২০১৪
একটি ইমেইলে এপস্টেইন হফম্যানের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, হরদীপকে কি আপনার উপকারী মনে হল? রিড হফম্যান পরের দিন জবাব দেন, জটিল।
অক্টোবর ২৪, ২০১৪
জেফরি এপস্টেইন হরদীপ সিং পুরীকে ইমেইলে লেখেন, হরদীপ, আমার একটা সাহায্য দরকার। ভারতে একটি বিয়েতে অংশ নেওয়ার জন্য আমার এক সহায়কের দ্রুত ভিসা দরকার। দূতাবাসে কি এমন কেউ আছেন, যার সঙ্গে সে কথা বলতে পারে?
এর জবাবে হরদীপ সিং পুরী ২৪শ অক্টোবর অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত প্রমোদ বাজাজকে লিখেছিলেন, প্রমোদ, আপনি যদি এটিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করিয়ে দিতে পারে, তাহলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। আবেদনকারীকে অনুরোধ করব তিনি যেন আপনার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন।
একই সঙ্গে জেফরি এপস্টেইনকেও তিনি লেখেন, জেফরি, রাষ্ট্রদূত বাজাজ, যিনি এখন আমার সঙ্গে কাজ করেন, তিনি এটার ব্যবস্থা করবেন।

“প্রমোদ, যদি আপনি চান অনুরোধ করতে, সেজন্য নিউ ইয়র্কে থাকা সঞ্জীবকেও এখানে (ইমেইলে) কপি করা হল।”
সেদিনই প্রমোদ বাজাজ জেফরি এপস্টেইনকে ইমেইল করেন। সেখানে তিনি জানান যে আজকাল ‘ভিসা প্রক্রিয়াকরণ’ অনলাইনে হয় এবং “অনলাইনে আবেদন করার পরে তার হার্ড কপি “আউটসোর্স করা সংস্থার দফতরে জমা করতে হয়।”
শেষে তিনি লেখেন, এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই দয়া করে আমাকে জানাবেন। পরবর্তী প্রক্রিয়ায় আমি আপনাকে সহায়তা করব।
যদি আপনার সহকর্মীর অন্য কোনো সহায়তা বা তথ্য জানার থাকে তাহলে তিনি যেন নির্দ্বিধায় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, লিখেছিলেন প্রমোদ বাজাজ।
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার উল্লেখ
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম মেয়াদে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ প্রকল্প শুরু করা হয়েছিল ১ জুলাই, ২০১৫ তারিখে। তবে তার প্রায় সাড়ে সাত মাস আগে, ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হরদীপ সিং পুরী জেফরি এপস্টেইনকে একটি ইমেইল করে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র ব্যাপারে উল্লেখ করেছিলেন।
হরদীপ সিং পুরী লিখেছিলেন, জেফ, আমি আপনাকে তেসরা অক্টোবর সিলিকন ভ্যালিতে রিডের সঙ্গে আমার বৈঠকের ব্যাপারে জানিয়েছিলাম। আপনার প্রতিক্রিয়া ছিল যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারত সফর করা উচিত রিডের। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে ফিরে আসার পর আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী যে ভারতে এখন ইন্টারনেট-ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি দুর্দান্ত সুযোগ রয়েছে।

“উদাহরণস্বরূপ, টেলিকম এবং ইন্টারনেটের বড় জাপানি সংস্থা সফটব্যাংক সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, তারা আগামী দশ বছরে ভারতীয় ই-কমার্স খাতে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে। ভারতীয় সংস্থা স্ন্যাপডিল প্রথম এমন একটি সংস্থা যারা ৬০ কোটি ডলারের তহবিল পেয়েছে। শক্তিশালী জনাদেশ নিয়ে নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই বাজারে ওঠা-নামা আরও বেড়ে গেছে। এই ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র প্রতি বিশেষ নজর ভারতীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন উঠছে যে ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পের সূচনাই যেখানে ২০১৫ সালে হল, তখন ২০১৪ সালেই হরদীপ সিং পুরী কীভাবে ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে বিষয়টি নিয়ে এপস্টেইনের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন?
বিরোধীরা যেসব প্রশ্ন তুলছে
এপস্টেইন ফাইলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর নাম প্রকাশিত হওয়ার পর কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ জোরদার করেছে। এটিকে গুরুতর ইস্যু আখ্যা দিয়ে দলটি মন্ত্রীর কাছে জবাব চেয়ে কয়েকটি প্রশ্নও তুলেছে।
কংগ্রেসের প্রথম দাবি, হরদীপ সিং পুরীর পদত্যাগ করা উচিত। কংগ্রেস বলছে, যখন কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর নাম আন্তর্জাতিক স্তরের ফৌজদারি তদন্ত সংক্রান্ত নথিতে উঠে আসে, তখন নৈতিকভাবেই তার পদে থাকা উচিত নয়।
হরদীপ সিং পুরীর ই-মেইল নিয়ে কংগ্রেস দল ছয়টি প্রশ্ন তুলেছে:
প্রথমত, এপ রিডের সঙ্গে হরদীপ সিং পুরীর সাক্ষাতের বিষয়টা এপস্টেইন কীভাবে আগে থেকেই জানতে পেরেছিলেন? দ্বিতীয়ত, এপস্টেইনই কি সেই মধ্যস্থতাকারী, যিনি রিড হফম্যানের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন?
তৃতীয় যে প্রশ্নটি কংগ্রেস তুলেছে, তা হল, হরদীপ সিং পুরী কেন ওই বৈঠকের ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করছিলেন? চতুর্থ প্রশ্ন, এপস্টেইনকে কেন ‘বন্ধু’ হিসাবে সম্বোধন করা হয়েছিল?
পঞ্চম, এপস্টেইন হরদীপ সিং পুরীকে দিয়ে কী করাচ্ছিলেন? কংগ্রেসের শেষ প্রশ্ন, যদি তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি কাকতালীয়ই হয় তাহলে মন্ত্রী কেন এপস্টেইনের কাছ থেকে ‘পরামর্শ’ নিচ্ছিলেন?
এদিকে, কংগ্রেস নেতা পবন খেরা গত সপ্তাহে দাবি করেছেন যে ২০১৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী আর যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের মধ্যে ৬২ বার ইমেইল চালাচালি হয়েছে।
আত্মপক্ষ সমর্থনে কী বললেন হরদীপ সিং পুরী?
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী আত্মপক্ষ সমর্থন করতে কিছুদিন আগে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
হরদীপ সিং পুরী বলেন, এপস্টেইন মামলাগুলি অন্যায় কাজ এবং অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযোগ রয়েছে যে তিনি একটি দ্বীপের মালিক ছিলেন। সেখানে তিনি মানুষকে যৌন ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত করতে নিয়ে যেতেন। তার বিরুদ্ধে শিশুদের ওপরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। এই সব অপরাধের ভুক্তভোগীরাও আছে। তারা মামলা দায়ের করেছে। এগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
এপস্টেইনের সঙ্গে জড়িত ৩০ লাখ ফাইল প্রকাশিত হয়েছে। আমি নিউ ইয়র্কে আট বছর ছিলাম। আমি ২০০৯ সালের মে মাসে জাতিসংঘে ভারতের রাষ্ট্রদূত হই, ২০১৭ সালে মন্ত্রী হই। এই আট বছরে সম্ভবত তিন-চারটি বৈঠকের উল্লেখ রয়েছে, জানিয়েছেন হরদীপ পুরী।
হরদীপ পুরী বলেন, তিনি নিউইয়র্ক সমাজের একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। তার সঙ্গে যুক্ত অর্ধেক মানুষই তার অতীত সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। কিন্তু এখানে বিষয়টা তা নয়। আমাদের মতো মানুষদের জীবনে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গেই দেখা করতে হয়।
আট বছরে, কেবল দুটি রেফারেন্স রয়েছে -অথবা একটি ইমেইল, আমার পরিচিত ব্যক্তিরা একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যার নাম রিড হফম্যান। রিড হফম্যান লিঙ্কডইনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। আমি তো লিঙ্কডইনের রিড হফম্যানের সঙ্গে দেখা করেছি এবং বৈঠকের পরে আমি একটি বার্তা পাঠিয়েছি, জানিয়েছেন হরদীপ পুরী।
আমি ২০১৪ সালের নভেম্বর ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রসঙ্গে কথা বলেছি। যদি আমার সঠিক মনে থাকে, ওই প্রকল্পটি চালু হয়েছিল ২০১৫ সালে। একজন দূরদর্শী বেসরকারি নাগরিক হিসাবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে মোসি সরকার কী ধরনের কাজ করতে চলেছে, জানিয়েছেন হরদীপ পুরী।
এপস্টেইনের এক সহযোগীকে ভিসা পেতে সহায়তা করার ব্যাপারে হরদীপ পুরী বলেন, ভিসার জন্য যে অনুরোধ এসেছিল, আমি তার জবাব দিই নি। আমার এক সহকর্মীর কাছে সেটি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি ওই অনুরোধ একজনকে পাঠিয়েছিলেন, যিনি বলেছিলেন যেন অনলাইনে আবেদন জানানো হয়। এটা কি কারো উপকার করা?

























