২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ১৭ মাস পর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে রাষ্ট্র সংস্কারের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নে গণভোটও হবে। বৃহস্পতিবারের এই ভোটকে ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ‘বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের ভোটারদের প্রত্যাশা: চাকরি, সুশাসন ও স্বাধীনতা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তরুণ ভোটারদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে কর্মসংস্থান, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং ভয়ভীতি ছাড়া মতপ্রকাশের অধিকার। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণ–অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশটিতে ২০০৯ সালের পর এটিই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি; নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাড়ে ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশটিতে কয়েক মাসের অস্থিরতায় তৈরি পোশাকসহ বড় শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি ‘গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনে বাংলাদেশে বেশি ভোটারের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা’ শিরোনামে জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন ব্যাপক ভোটার উপস্থিতির আশা করছে। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর এটি প্রথম নির্বাচন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এএফপি জানায়, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা আবুল ফজল মুহাম্মদ সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমানে ২০ ও ৩০-এর কোঠায় থাকা বহু তরুণ অতীতে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে কার্যত বঞ্চিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ‘বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের নানা দাবি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ ভোটার আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জন্য নতুন দিকনির্দেশনার প্রত্যাশা করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার পতনের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা তরুণদের কাছে এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ‘২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে নিরাপত্তা জোরদার’ শিরোনামে জানিয়েছে, ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান এবং তাঁর দেশত্যাগের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁদের সহায়তায় এক লাখ সেনাসদস্যসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার এই নির্বাচনে তালিকাভুক্ত।
জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ‘বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে ইসলামপন্থীদের প্রভাব বাড়ছে’ শিরোনামে জানিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সাম্প্রতিক সময়ের অন্য যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোটবদ্ধ একটি ইসলামপন্থী দল শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডয়চে ভেলে আরও বলেছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো ইসলামপন্থী শক্তিগুলো সবচেয়ে দৃশ্যমান নির্বাচনী উপস্থিতি দেখাতে প্রস্তুত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু ‘বাংলাদেশের নির্বাচন: ৫০ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, অধিকাংশ কেন্দ্রে নজরদারি ক্যামেরা’ শিরোনামে জানিয়েছে, সাধারণ নির্বাচনের জন্য অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রের ৯০ শতাংশে নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকায় দায়িত্বে থাকা বহু পুলিশ সদস্য দেহে ধারণযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহার করবেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—এসব বিষয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।



















