Dhaka ০৭:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গাজায় ভয়াবহ অস্ত্র ব্যবহার ইসরায়েলের, ‘বাতাসে মিলিয়ে গেছেন’ হাজারো ফিলিস্তিনি

Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩১:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ২ Time View


গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে হাজারো ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষের কোনো দেহাবশেষই পাওয়া যায়নি। আল জাজিরা আরবির এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এভাবে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৮৪২ জন।

২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা শহরের আল-তাবিন স্কুলে ইসরায়েলি হামলার পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর ছেলেকে খুঁজছিলেন ইয়াসমিন মাহানি। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এলাকায় তিনি স্বামীকে পেলেও ছেলে সাদ মাহানির কোনো খোঁজ মেলেনি। হাসপাতাল ও মর্গে দিনের পর দিন খুঁজেও ছেলের কোনো দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি।

আল জাজিরা আরবির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ এমন ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনিকে নথিভুক্ত করেছে, যাদের দেহের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। হামলার স্থানে রক্তের ছিটা বা মাংসের ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনি।

সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, প্রতিটি হামলার পর ‘বিয়োজন পদ্ধতি’ অনুসরণ করা হয়। কোনো বাড়িতে কতজন মানুষ ছিলেন, তা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেনে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় মরদেহ কম পাওয়া গেলে এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও কিছু না মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

তদন্তে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ থার্মাল ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এসব অস্ত্র বিস্ফোরণের সময় কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সৃষ্টি করে, যা মানবদেহকে মুহূর্তের মধ্যে ভস্মে পরিণত করতে পারে।

রুশ সামরিক বিশ্লেষক ভাসিলি ফাতিগারভ জানান, থার্মোবারিক অস্ত্রে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও টাইটানিয়ামের মতো ধাতব গুঁড়া ব্যবহার করা হয়, যা বিস্ফোরণের তাপমাত্রা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে যায়। এতে প্রবল তাপ ও চাপ তৈরি হয়ে দেহের ভেতরের তরল অংশ দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, মানবদেহের বড় অংশই পানি। চরম তাপমাত্রা ও চাপের ফলে দেহের তরল অংশ মুহূর্তেই ফুটে উঠে টিস্যু বাষ্পীভূত হয়ে যায়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অনিবার্য।

অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কয়েকটি নির্দিষ্ট বোমার ব্যবহারের কথাও উঠে এসেছে, যেগুলোর বিস্ফোরণে ভবনের কাঠামো আংশিক অক্ষত থাকলেও ভেতরের মানুষ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, বিভিন্ন হামলার স্থানে এসব অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের দায় শুধু ইসরায়েলের নয়, অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর দায়ও এড়ানো যায় না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তু আলাদা করতে অক্ষম অস্ত্র ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের শামিল।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নির্দেশনার পরও সহিংসতা কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষকদের মতে, গাজার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।

যুদ্ধাহতদের স্বজনদের কাছে এসব আইনি ব্যাখ্যার তেমন গুরুত্ব নেই। বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে চার সন্তান হারানো রফিক বদরান বলেন, সন্তানদের দেহের সামান্য অংশ ছাড়া কিছুই উদ্ধার করতে পারেননি। তাঁর প্রশ্ন, ‘ওরা কোথায় চলে গেল?’



Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
.design-developed a { text-decoration: none; color: #000000; font-weight: 700;

গাজায় ভয়াবহ অস্ত্র ব্যবহার ইসরায়েলের, ‘বাতাসে মিলিয়ে গেছেন’ হাজারো ফিলিস্তিনি

Update Time : ১০:৩১:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে হাজারো ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষের কোনো দেহাবশেষই পাওয়া যায়নি। আল জাজিরা আরবির এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এভাবে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৮৪২ জন।

২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা শহরের আল-তাবিন স্কুলে ইসরায়েলি হামলার পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর ছেলেকে খুঁজছিলেন ইয়াসমিন মাহানি। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এলাকায় তিনি স্বামীকে পেলেও ছেলে সাদ মাহানির কোনো খোঁজ মেলেনি। হাসপাতাল ও মর্গে দিনের পর দিন খুঁজেও ছেলের কোনো দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি।

আল জাজিরা আরবির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ এমন ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনিকে নথিভুক্ত করেছে, যাদের দেহের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। হামলার স্থানে রক্তের ছিটা বা মাংসের ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনি।

সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, প্রতিটি হামলার পর ‘বিয়োজন পদ্ধতি’ অনুসরণ করা হয়। কোনো বাড়িতে কতজন মানুষ ছিলেন, তা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেনে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় মরদেহ কম পাওয়া গেলে এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও কিছু না মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

তদন্তে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ থার্মাল ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এসব অস্ত্র বিস্ফোরণের সময় কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সৃষ্টি করে, যা মানবদেহকে মুহূর্তের মধ্যে ভস্মে পরিণত করতে পারে।

রুশ সামরিক বিশ্লেষক ভাসিলি ফাতিগারভ জানান, থার্মোবারিক অস্ত্রে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও টাইটানিয়ামের মতো ধাতব গুঁড়া ব্যবহার করা হয়, যা বিস্ফোরণের তাপমাত্রা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে যায়। এতে প্রবল তাপ ও চাপ তৈরি হয়ে দেহের ভেতরের তরল অংশ দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, মানবদেহের বড় অংশই পানি। চরম তাপমাত্রা ও চাপের ফলে দেহের তরল অংশ মুহূর্তেই ফুটে উঠে টিস্যু বাষ্পীভূত হয়ে যায়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অনিবার্য।

অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কয়েকটি নির্দিষ্ট বোমার ব্যবহারের কথাও উঠে এসেছে, যেগুলোর বিস্ফোরণে ভবনের কাঠামো আংশিক অক্ষত থাকলেও ভেতরের মানুষ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, বিভিন্ন হামলার স্থানে এসব অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের দায় শুধু ইসরায়েলের নয়, অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর দায়ও এড়ানো যায় না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তু আলাদা করতে অক্ষম অস্ত্র ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের শামিল।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নির্দেশনার পরও সহিংসতা কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষকদের মতে, গাজার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।

যুদ্ধাহতদের স্বজনদের কাছে এসব আইনি ব্যাখ্যার তেমন গুরুত্ব নেই। বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে চার সন্তান হারানো রফিক বদরান বলেন, সন্তানদের দেহের সামান্য অংশ ছাড়া কিছুই উদ্ধার করতে পারেননি। তাঁর প্রশ্ন, ‘ওরা কোথায় চলে গেল?’