Dhaka ০৪:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চলতি বছরের যুদ্ধ: ইরান-ইসরায়েল থেকে ভারত-পাকিস্তান

Reporter Name
  • Update Time : ০২:৩১:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৯ Time View


বিশ্বব্যাপী সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যুদ্ধ-সংঘাত। পূর্ব থেকে পশ্চিমে – উত্তর থেকে দক্ষিণে যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ যেন আরও বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, কিংবা এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে শুরু হওয়া সংঘাতের সঙ্গে চলতি বছরও নতুন করে ইতিহাসের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ। চলুন সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলোই দেখে নেওয়া যাক:

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ

২০২৫ সালের ১৩ জুন ভোর ৩টা ১৫ মিনিটে একাধিক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল ইরানের রাজধানী তেহরান। ২০০টিরও বেশি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানজুড়ে ১০০টিরও বেশি পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকাগুলোতে হামলা করে। গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং সামরিক কমান্ডারদের হত্যা করার পর দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনের তীব্র সংঘাত শুরু হয়।

এভাবে ইসরায়েলি বিমান হামলা পরবর্তী ১২ দিন ধরে অব্যাহত ছিলো- নেতানিয়াহু সরকার যার নাম দেন অপারেশন ‘রাইজিং লায়ন’। বিস্তৃত পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করা এই হামলার জবাবে ইরানও ইতিহাসের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে তীব্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে হুমকির জবাব দেয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিদিন শত শত মিসাইল ছোড়ে- যার মধ্যে ৫০০টিরও বেশি ছিলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।


ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরায়েলি স্থাপনাগুলো। ছবি: সংগৃহীত

অনেকের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান এবং জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সরাসরি সংঘাত অনিবার্য ছিল। কেননা ফিলিস্তিনের গাজায় ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর উভয় পক্ষ বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার কাছাকাছি চলে এসেছিল- চলতে থাকে অপারেশন ‘ট্রু প্রমিজ’ সিরিজ। ইরান সবশেষ পাল্টা হামলাগুলোকে অপারেশন ‘ট্রু প্রমিজ ৩’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এভাবে হামলা-পাল্টা হামলার পর ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়।

কোন পক্ষের কতজন প্রাণ হারালেন

ইরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, ইসরায়েলি আগ্রাসী হামলায় পরমাণু বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাসহ শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। সেই সঙ্গে বেশ কিছু সরকারি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন স্টেশনে ইসরায়েলি বোমা হামলার পরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

মোট নিহত ও আহত: ৬১০ জন- যার মধ্যে ৪৯ জন নারী এবং ১৩ জন শিশু রয়েছে। সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স ছিলো মাত্র দুই মাস। এছাড়া মোট আহত হয়েছেন ৪৭৪৬ জন- যার মধ্যে ১৮৫ জন নারী। সেই সঙ্গে অবকাঠামোগত ক্ষতির মধ্যে ৭টি হাসপাতাল, ৯টি অ্যাম্বুলেন্স, ৪টি স্বাস্থ্য ইউনিট এবং ৬টি জরুরি ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইসরায়েল তাদের ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ও পরিমাণ গোপন রাখার চেষ্টা করেছে, বিশেষ করে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ ও ছবি প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন পর্যন্ত ইসরায়েলজুড়ে নিহত ২৮ জন এবং আহত কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ হাজার ২৩৮ জন।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ

চলতি বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বল্প কিন্তু তীব্র সামরিক সংঘর্ষ হয়েছিল। মূলত জম্মু ও কাশ্মিরের পেহেলগামে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার এক মাস পর তিন দিনের ওই সংঘাত ঘটে। ভারত দাবি করে, এই সশস্ত্র হামলার পেছনে পাকিস্তানের ইশারা রয়েছে- বিশেষ করে তাদের গোয়েন্দা ও সেনাবাহিনী সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পেহেলগামের ঘটানোর জন্য দায়ী। তবে পাকিস্তান এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তদন্তের আহ্বান জানায়।

এরপর দুই প্রতিবেশী দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি নানা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে থাকে। এরপরই সেই উত্তেজনা সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। ৭ মে সকালে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের চারটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত। তারা এর নাম দেয় ‘অপারেশন সিন্দুর’।


ভারতের যুদ্ধবিমান ভুপাতিতের দাবি করেছে পাকিস্তান। ছবি: সংগৃহীত

পরের দিনগুলোতে দুই দেশই একে অপরের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং একে অপরকে হামলার জন্য দায়ী করেছে। ১০ মে উভয় দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। ভারত শুরুতে পাকিস্তানের তিনটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়- যার একটি ছিল রাওয়ালপিন্ডি। এরপর ভারত আরও কিছু পাকিস্তানি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা এবং ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অবস্থিত সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়- ভারতের অন্তত চারটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে।

পরিস্থিতি যখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে যাচ্ছিল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন এবং দাবি করেন, এ যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হয়েছে। পাকিস্তান এ উদ্যোগের প্রশংসা করলেও ভারত বলছে, বাইরের কারও হস্তক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যেই হয়েছে।

যুদ্ধবিরতির পর উভয় দেশই সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের ‘জয়’ দাবি করে এবং নানা ‘প্রমাণ’ উপস্থাপন করে। এরপর ভারত ও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তারা ফোনে কথা বলেন এবং আগামী দিনগুলোতে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার অঙ্গীকার করেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুসারে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, তা প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতি ও বিনিয়োগে। এই যুদ্ধের পর ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং এশীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সবচেয়ে বেশি শুল্কর মুখে পড়ে। অপরদিকে, পাকিস্তানের সরকারের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক আগের চেয়ে আরও মজবুত হয় এবং উভয়ে বাণিজ্যসহ বেশকিছু সমঝোতায় আসে।

গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধ

আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর ‘তাণ্ডবের’ জবাবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধিনতাকামী সংগঠন হামাস। ইরান-সমর্থিত সংগঠনটি এই অভিযানের নাম দেয় ‘আল আকসা স্টর্ম’। এই হামলার পর নেতানিয়াহু সরকার জানায়, সেনাসহ অন্তত এক হাজার ২০০ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। এই অভিযানে মূলত ইসরায়েলের তথাকথিত ‘দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার গৌরব’ ভেঙে ফেলে হামাস।


ইসরায়েলি বর্বর হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা শহর। ছবি: সংগৃহীত

এরপরই শুরু হয় গাজায় ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা। প্রথম ছয় সপ্তাহেই ১৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বিভিন্ন অংশে আশ্রয় নিতে থাকে। বিরামহীন হামলার ফলে বারবার মৃত্যু আর বাস্তুচ্যুতির চক্রে আটকে যায় গাজাবাসী।

গণহত্যার এই যুদ্ধে অঞ্চলজুড়ে সবশেষ নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং একই সময়ে ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। গত ১১ অক্টোবর থেকে গাজায় মার্কিন মধ্যস্ততায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে- যদিও মাঝে কয়েকবার যুদ্ধিবিরতি হয়েছিল এবং ইসরায়েল সবশেষ যুদ্ধবিরতিও লঙ্ঘন করে চলেছে।

চলতি বছরের শুরুতে একটি যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে ইসরায়েল গত ২৭ মে থেকে গাজায় পৃথক সাহায্য বিতরণ উদ্যোগ শুরু করেছিল। এই পদক্ষেপের পর অঞ্চলটিতে দুর্ভিক্ষ প্রকট হয়ে ওঠে। ইসরায়েলি বাহিনী খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপরও গুলি চালিয়ে যায়। এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়, সেই সঙ্গে দুর্ভিক্ষে শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু হয়।


ইসরায়েলি বর্বর হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা শহর। ছবি: সংগৃহীত

বারবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইসরায়েলের গণহত্যার সংবাদ ব্যাপক সেন্সর করা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে সারা বিশ্বেই তরুণ প্রজন্ম এ নিয়ে সরব হয়ে ওঠে- ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিক্ষোভ হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদ ও অবস্থান ধর্মঘটের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় এলে মূলত প্রতিবাদের এই জোয়ার সৃষ্টি হয়। একসময় আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নরওয়ে, ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নেতানিয়াহু ও তার প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। উপত্যকাজুড়ে যুদ্ধের জন্য ইসরায়েল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলার মুখোমুখি।  দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলায় পরে বেলজিয়াম, কলম্বিয়া, তুরস্ক, মিশর, চিলি ও স্পেনসহ অন্তত ১৪টি দেশ সমর্থন জানিয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনীয় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়ায় রাশিয়ান বাহিনীর আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এই যুদ্ধ। স্থানীয় রুশপন্থী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আকস্মিক অভিযানে এই অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণে নেয় রুশ সেনারা। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় রূপ পায়। যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে রাশিয়ান বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে- তবে ইউক্রেনীয়রা রাজধানী কিয়েভ এবং অন্যান্য প্রধান শহর দখলের প্রচেষ্টা থামিয়ে দেয় এবং রাশিয়ান অবস্থানগুলোতে পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়।

অত্যাধুনিক সব অস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে- পূর্বে কখনো ব্যবহার করা হয়নি এমন মিসাইল, ড্রোন ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামের ব্যবহার দেখা গেছে। চলমান এই যুদ্ধে রাশিয়া কিংবা ইউক্রেন কেউই নিজেদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেয়নি। বিভিন্ন সংস্থাসহ উভয় পক্ষের দেওয়া বিপরীতমুখী প্রতিবেদন থেকে অনুমান করা হয়, লাখ লাখ মানুষ এই যুদ্ধে প্রাণ হারাতে পারেন- বিশেষ করে ফ্রন্টলাইনের সেনারা। শহরগুলোতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলমান। ছবি: সংগৃহীত

এই যুদ্ধে ইউক্রেনের বেশকিছু শহরের পতন হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি পুতিনের বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তবে যুদ্ধটি কেবল রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। কিয়েভের পশ্চিমা মিত্ররা ইউক্রেনকে অস্ত্র ও ঋণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে পূর্ণ সহায়তা দিলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের আগে থেকেই এই যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টার কথা বলে আসছেন।

সবশেষ আপডেট: সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৮-দফা শান্তি পরিকল্পনার খসড়া প্রস্তাব করেছেন। চুক্তির অধীনে দেখা গেছে- ইউক্রেনকে রাশিয়ার কাছে অতিরিক্ত অঞ্চল সমর্পণ করতে হবে, সামরিক বাহিনীর আকার সীমিত করতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের জন্য প্রচেষ্টা ত্যাগ করতে হবে। এই পরিকল্পনার বিষয়গুলো নিয়ে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইউক্রেনের জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে মীমাংসার জন্য ট্রাম্পের কর্মকর্তারা রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে- এমনকি পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্প নিজেও ফোনালাপ করে যাচ্ছেন।

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া যুদ্ধ

সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে থাইল্যান্ডের সেনারা আহত হলে কম্বোডিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিরোধ পুনরায় শুরু হয়েছিল। এরপর থেকে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ২৪ জুলাই সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। অতীতে ফ্রান্সের টেনে দেওয়া সীমানা নিয়ে তাদের এই দ্বন্দ্ব অর্ধশতাব্দী প্রাচীন। এর আগেও ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে উভয় পক্ষ সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

২৩ জুলাই একটি সীমান্ত জেলায় ল্যান্ডমাইনে থাই সৈন্য পা হারান। এরপর থাই বাহিনী যুদ্ধবিমান দিয়ে কম্বোডিয়ান সীমান্তে হামলা করে। কম্বোডিয়াও কামানের গোলা ছোড়ে এবং সীমান্তে তীব্র গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। উভয় প্রতিবেশী এগুলোকে ‘আত্মরক্ষার জন্য’ কাজ বলে দাবি করে।


থাইল্যান্ডের সঙ্গে সম্প্রতি কম্বোডিয়ার সীমান্ত সংঘাতে সেনাসহ বেসামরিক মানুষও প্রাণ হারিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

এক পর্যায়ে আসিয়ান দেশগুলো এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করে উভয় দেশের শীর্ষ নেতারা। এই সংঘাতে ২৬ জুলাই পর্যন্ত উভয় দেশের কমপক্ষে ৩২ জন নিহত হয়।

দ্বিতীয়বার সংঘাত: মালয়েশিয়ায় যুদ্ধবিরতি হতে না হতেই দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে- যখন ২৫ ডিসেম্বর রাতে থাই বাহিনী আবারও মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে কম্বোডিয়া সীমান্তে বোমা ফেলে। এর ফলে পূর্বের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। কয়েকদিন ধরে দুই দেশের চলা সংঘাতে ৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় দশ লাখ মানুষ সাময়িক বাস্তুচ্যুত হয়। এরপর ২৭ ডিসেম্বর দুই প্রতিবেশী আবারও মীমাংসার টেবিলে আসে এবং একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে- যা এখনো চলছে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত

২৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর অভিন্ন জীবনধারার কারণে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক মিলের সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে তীব্র বিরোধও হয়েছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের চলতি বছরের অক্টোবরের সংঘাত শুরু হয় মূলত এখান থেকেই। দুই প্রতিবেশীর দীর্ঘ সীমান্ত পাকিস্তান বৈধ মনে করলেও কাবুল বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে। এছাড়া ইসলামাবাদ কাবুলের বিরুদ্ধে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ করলেও আফগান তালেবান তা অস্বীকার করে আসছে।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী তালেবানকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পর পাকিস্তান ছিলো তালেবানের প্রধান সমর্থক। ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে মার্কিন দখলবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানো তালেবান যোদ্ধাদের আশ্রয়ও দিয়েছে পাকিস্তান। তবে সাম্প্রতিক বছরে পাকিস্তানের ভেতর হামলা বেড়ে যাওয়া নিয়ে আফগান তালেবান ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। টিটিপিকে বর্তমানে পাকিস্তানের ‘বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। গত এক বছরে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ৬০০-এর বেশি হামলা চালিয়েছে।


সীমান্তে আফগান সেনারা। ছবি: সংগৃহীত

মূলত এসব দ্বন্দের মাঝে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় ৯ অক্টোবর রাতে- যখন পাকিস্তানি বিমান বাহিনী আফগান রাজধানী কাবুলসহ কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, টিটিপির একাধিক আস্তানা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে- তবে প্রধান লক্ষবস্তু ছিলেন কাবুলে অবস্থানরত টিটিপির আমির।

তালেবান সরকার এটিকে আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে এবং ১১ ও ১২ অক্টোবর রাতে তালেবান যোদ্ধারা সীমান্তের একাধিক পাকিস্তানি সামরিক পোস্টে হামলা শুরু করে। হামলার পর তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করলে পাকিস্তানের সেনারাও বিমান হামলার সঙ্গে সিমান্তজুড়ে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। এ নিয়ে টানা কয়েকদিনের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের সেনাসহ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। এরপর কাতার, তুরস্ক ও কিছু আরব দেশের মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উভয় সীমান্তে উত্তেজনা রয়েই গেছে।

মিয়ানমার সংকট

অং সান সু চি পতন থেকে বর্তমানে জান্তা সরকারের নির্বাচন পর্যন্ত মিয়ানমারে বর্তমান বিশৃঙ্খলা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটি গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক সংকটে নিমজ্জিত। অভ্যুত্থানে সু চির সরকারকে উল্টে দিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে- যা গৃহযুদ্ধ, শরণার্থী সংকট এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি বিতর্কিত নির্বাচনের দিকে নিয়ে গেছে। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি দলের নেতৃত্বে ২০২০ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন নোবেলবিজয়ী সূচি। কিন্তু সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইং নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে সূচিকে গ্রেপ্তার এবং ক্ষমতা দখল করেন। জাতিসংঘসহ পশ্চিমা সরকারগুলো এটিকে ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সূচি এখন ২৭ বছরের সাজা ভোগ করছেন।


মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে বিমান হামলা, গ্রাম পোড়ানো এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা বেড়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

ধারণা করা হয়, এই অভ্যুত্থানের পর ১৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। পরবর্তীতে বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে। কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি, আরাকান আর্মি, তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের মতো সশস্ত্র দলগুলো জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। যুদ্ধে বিমান হামলা, গ্রাম পোড়ানো এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা বেড়ে যায়।

২০২৫ সালের বিভিন্ন হিসাবে ৩০ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে এবং ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাসিন্দা বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুসারে, এই গৃহযুদ্ধে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলেও জান্তা সরকার চলতি ডিসেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ের একটি নির্বাচন শুরু করেছে – ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটি অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন।



Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
.design-developed a { text-decoration: none; color: #000000; font-weight: 700;

চলতি বছরের যুদ্ধ: ইরান-ইসরায়েল থেকে ভারত-পাকিস্তান

Update Time : ০২:৩১:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫


বিশ্বব্যাপী সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যুদ্ধ-সংঘাত। পূর্ব থেকে পশ্চিমে – উত্তর থেকে দক্ষিণে যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ যেন আরও বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, কিংবা এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে শুরু হওয়া সংঘাতের সঙ্গে চলতি বছরও নতুন করে ইতিহাসের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ। চলুন সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলোই দেখে নেওয়া যাক:

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ

২০২৫ সালের ১৩ জুন ভোর ৩টা ১৫ মিনিটে একাধিক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল ইরানের রাজধানী তেহরান। ২০০টিরও বেশি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানজুড়ে ১০০টিরও বেশি পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকাগুলোতে হামলা করে। গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং সামরিক কমান্ডারদের হত্যা করার পর দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনের তীব্র সংঘাত শুরু হয়।

এভাবে ইসরায়েলি বিমান হামলা পরবর্তী ১২ দিন ধরে অব্যাহত ছিলো- নেতানিয়াহু সরকার যার নাম দেন অপারেশন ‘রাইজিং লায়ন’। বিস্তৃত পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করা এই হামলার জবাবে ইরানও ইতিহাসের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে তীব্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে হুমকির জবাব দেয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিদিন শত শত মিসাইল ছোড়ে- যার মধ্যে ৫০০টিরও বেশি ছিলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।


ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরায়েলি স্থাপনাগুলো। ছবি: সংগৃহীত

অনেকের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান এবং জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সরাসরি সংঘাত অনিবার্য ছিল। কেননা ফিলিস্তিনের গাজায় ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর উভয় পক্ষ বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার কাছাকাছি চলে এসেছিল- চলতে থাকে অপারেশন ‘ট্রু প্রমিজ’ সিরিজ। ইরান সবশেষ পাল্টা হামলাগুলোকে অপারেশন ‘ট্রু প্রমিজ ৩’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এভাবে হামলা-পাল্টা হামলার পর ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়।

কোন পক্ষের কতজন প্রাণ হারালেন

ইরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, ইসরায়েলি আগ্রাসী হামলায় পরমাণু বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাসহ শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। সেই সঙ্গে বেশ কিছু সরকারি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন স্টেশনে ইসরায়েলি বোমা হামলার পরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

মোট নিহত ও আহত: ৬১০ জন- যার মধ্যে ৪৯ জন নারী এবং ১৩ জন শিশু রয়েছে। সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স ছিলো মাত্র দুই মাস। এছাড়া মোট আহত হয়েছেন ৪৭৪৬ জন- যার মধ্যে ১৮৫ জন নারী। সেই সঙ্গে অবকাঠামোগত ক্ষতির মধ্যে ৭টি হাসপাতাল, ৯টি অ্যাম্বুলেন্স, ৪টি স্বাস্থ্য ইউনিট এবং ৬টি জরুরি ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইসরায়েল তাদের ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ও পরিমাণ গোপন রাখার চেষ্টা করেছে, বিশেষ করে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ ও ছবি প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন পর্যন্ত ইসরায়েলজুড়ে নিহত ২৮ জন এবং আহত কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ হাজার ২৩৮ জন।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ

চলতি বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বল্প কিন্তু তীব্র সামরিক সংঘর্ষ হয়েছিল। মূলত জম্মু ও কাশ্মিরের পেহেলগামে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার এক মাস পর তিন দিনের ওই সংঘাত ঘটে। ভারত দাবি করে, এই সশস্ত্র হামলার পেছনে পাকিস্তানের ইশারা রয়েছে- বিশেষ করে তাদের গোয়েন্দা ও সেনাবাহিনী সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পেহেলগামের ঘটানোর জন্য দায়ী। তবে পাকিস্তান এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তদন্তের আহ্বান জানায়।

এরপর দুই প্রতিবেশী দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি নানা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে থাকে। এরপরই সেই উত্তেজনা সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। ৭ মে সকালে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের চারটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত। তারা এর নাম দেয় ‘অপারেশন সিন্দুর’।


ভারতের যুদ্ধবিমান ভুপাতিতের দাবি করেছে পাকিস্তান। ছবি: সংগৃহীত

পরের দিনগুলোতে দুই দেশই একে অপরের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং একে অপরকে হামলার জন্য দায়ী করেছে। ১০ মে উভয় দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। ভারত শুরুতে পাকিস্তানের তিনটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়- যার একটি ছিল রাওয়ালপিন্ডি। এরপর ভারত আরও কিছু পাকিস্তানি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা এবং ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অবস্থিত সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়- ভারতের অন্তত চারটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে।

পরিস্থিতি যখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে যাচ্ছিল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন এবং দাবি করেন, এ যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হয়েছে। পাকিস্তান এ উদ্যোগের প্রশংসা করলেও ভারত বলছে, বাইরের কারও হস্তক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যেই হয়েছে।

যুদ্ধবিরতির পর উভয় দেশই সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের ‘জয়’ দাবি করে এবং নানা ‘প্রমাণ’ উপস্থাপন করে। এরপর ভারত ও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তারা ফোনে কথা বলেন এবং আগামী দিনগুলোতে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার অঙ্গীকার করেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুসারে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, তা প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতি ও বিনিয়োগে। এই যুদ্ধের পর ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং এশীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সবচেয়ে বেশি শুল্কর মুখে পড়ে। অপরদিকে, পাকিস্তানের সরকারের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক আগের চেয়ে আরও মজবুত হয় এবং উভয়ে বাণিজ্যসহ বেশকিছু সমঝোতায় আসে।

গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধ

আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর ‘তাণ্ডবের’ জবাবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধিনতাকামী সংগঠন হামাস। ইরান-সমর্থিত সংগঠনটি এই অভিযানের নাম দেয় ‘আল আকসা স্টর্ম’। এই হামলার পর নেতানিয়াহু সরকার জানায়, সেনাসহ অন্তত এক হাজার ২০০ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। এই অভিযানে মূলত ইসরায়েলের তথাকথিত ‘দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার গৌরব’ ভেঙে ফেলে হামাস।


ইসরায়েলি বর্বর হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা শহর। ছবি: সংগৃহীত

এরপরই শুরু হয় গাজায় ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা। প্রথম ছয় সপ্তাহেই ১৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বিভিন্ন অংশে আশ্রয় নিতে থাকে। বিরামহীন হামলার ফলে বারবার মৃত্যু আর বাস্তুচ্যুতির চক্রে আটকে যায় গাজাবাসী।

গণহত্যার এই যুদ্ধে অঞ্চলজুড়ে সবশেষ নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং একই সময়ে ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। গত ১১ অক্টোবর থেকে গাজায় মার্কিন মধ্যস্ততায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে- যদিও মাঝে কয়েকবার যুদ্ধিবিরতি হয়েছিল এবং ইসরায়েল সবশেষ যুদ্ধবিরতিও লঙ্ঘন করে চলেছে।

চলতি বছরের শুরুতে একটি যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে ইসরায়েল গত ২৭ মে থেকে গাজায় পৃথক সাহায্য বিতরণ উদ্যোগ শুরু করেছিল। এই পদক্ষেপের পর অঞ্চলটিতে দুর্ভিক্ষ প্রকট হয়ে ওঠে। ইসরায়েলি বাহিনী খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপরও গুলি চালিয়ে যায়। এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়, সেই সঙ্গে দুর্ভিক্ষে শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু হয়।


ইসরায়েলি বর্বর হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা শহর। ছবি: সংগৃহীত

বারবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইসরায়েলের গণহত্যার সংবাদ ব্যাপক সেন্সর করা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে সারা বিশ্বেই তরুণ প্রজন্ম এ নিয়ে সরব হয়ে ওঠে- ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিক্ষোভ হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদ ও অবস্থান ধর্মঘটের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় এলে মূলত প্রতিবাদের এই জোয়ার সৃষ্টি হয়। একসময় আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নরওয়ে, ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নেতানিয়াহু ও তার প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। উপত্যকাজুড়ে যুদ্ধের জন্য ইসরায়েল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলার মুখোমুখি।  দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলায় পরে বেলজিয়াম, কলম্বিয়া, তুরস্ক, মিশর, চিলি ও স্পেনসহ অন্তত ১৪টি দেশ সমর্থন জানিয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনীয় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়ায় রাশিয়ান বাহিনীর আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এই যুদ্ধ। স্থানীয় রুশপন্থী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আকস্মিক অভিযানে এই অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণে নেয় রুশ সেনারা। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় রূপ পায়। যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে রাশিয়ান বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে- তবে ইউক্রেনীয়রা রাজধানী কিয়েভ এবং অন্যান্য প্রধান শহর দখলের প্রচেষ্টা থামিয়ে দেয় এবং রাশিয়ান অবস্থানগুলোতে পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়।

অত্যাধুনিক সব অস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে- পূর্বে কখনো ব্যবহার করা হয়নি এমন মিসাইল, ড্রোন ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামের ব্যবহার দেখা গেছে। চলমান এই যুদ্ধে রাশিয়া কিংবা ইউক্রেন কেউই নিজেদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেয়নি। বিভিন্ন সংস্থাসহ উভয় পক্ষের দেওয়া বিপরীতমুখী প্রতিবেদন থেকে অনুমান করা হয়, লাখ লাখ মানুষ এই যুদ্ধে প্রাণ হারাতে পারেন- বিশেষ করে ফ্রন্টলাইনের সেনারা। শহরগুলোতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলমান। ছবি: সংগৃহীত

এই যুদ্ধে ইউক্রেনের বেশকিছু শহরের পতন হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি পুতিনের বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তবে যুদ্ধটি কেবল রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। কিয়েভের পশ্চিমা মিত্ররা ইউক্রেনকে অস্ত্র ও ঋণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে পূর্ণ সহায়তা দিলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের আগে থেকেই এই যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টার কথা বলে আসছেন।

সবশেষ আপডেট: সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৮-দফা শান্তি পরিকল্পনার খসড়া প্রস্তাব করেছেন। চুক্তির অধীনে দেখা গেছে- ইউক্রেনকে রাশিয়ার কাছে অতিরিক্ত অঞ্চল সমর্পণ করতে হবে, সামরিক বাহিনীর আকার সীমিত করতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের জন্য প্রচেষ্টা ত্যাগ করতে হবে। এই পরিকল্পনার বিষয়গুলো নিয়ে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইউক্রেনের জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে মীমাংসার জন্য ট্রাম্পের কর্মকর্তারা রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে- এমনকি পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্প নিজেও ফোনালাপ করে যাচ্ছেন।

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া যুদ্ধ

সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে থাইল্যান্ডের সেনারা আহত হলে কম্বোডিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিরোধ পুনরায় শুরু হয়েছিল। এরপর থেকে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ২৪ জুলাই সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। অতীতে ফ্রান্সের টেনে দেওয়া সীমানা নিয়ে তাদের এই দ্বন্দ্ব অর্ধশতাব্দী প্রাচীন। এর আগেও ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে উভয় পক্ষ সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

২৩ জুলাই একটি সীমান্ত জেলায় ল্যান্ডমাইনে থাই সৈন্য পা হারান। এরপর থাই বাহিনী যুদ্ধবিমান দিয়ে কম্বোডিয়ান সীমান্তে হামলা করে। কম্বোডিয়াও কামানের গোলা ছোড়ে এবং সীমান্তে তীব্র গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। উভয় প্রতিবেশী এগুলোকে ‘আত্মরক্ষার জন্য’ কাজ বলে দাবি করে।


থাইল্যান্ডের সঙ্গে সম্প্রতি কম্বোডিয়ার সীমান্ত সংঘাতে সেনাসহ বেসামরিক মানুষও প্রাণ হারিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

এক পর্যায়ে আসিয়ান দেশগুলো এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করে উভয় দেশের শীর্ষ নেতারা। এই সংঘাতে ২৬ জুলাই পর্যন্ত উভয় দেশের কমপক্ষে ৩২ জন নিহত হয়।

দ্বিতীয়বার সংঘাত: মালয়েশিয়ায় যুদ্ধবিরতি হতে না হতেই দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে- যখন ২৫ ডিসেম্বর রাতে থাই বাহিনী আবারও মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে কম্বোডিয়া সীমান্তে বোমা ফেলে। এর ফলে পূর্বের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। কয়েকদিন ধরে দুই দেশের চলা সংঘাতে ৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় দশ লাখ মানুষ সাময়িক বাস্তুচ্যুত হয়। এরপর ২৭ ডিসেম্বর দুই প্রতিবেশী আবারও মীমাংসার টেবিলে আসে এবং একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে- যা এখনো চলছে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত

২৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর অভিন্ন জীবনধারার কারণে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক মিলের সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে তীব্র বিরোধও হয়েছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের চলতি বছরের অক্টোবরের সংঘাত শুরু হয় মূলত এখান থেকেই। দুই প্রতিবেশীর দীর্ঘ সীমান্ত পাকিস্তান বৈধ মনে করলেও কাবুল বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে। এছাড়া ইসলামাবাদ কাবুলের বিরুদ্ধে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ করলেও আফগান তালেবান তা অস্বীকার করে আসছে।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী তালেবানকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পর পাকিস্তান ছিলো তালেবানের প্রধান সমর্থক। ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে মার্কিন দখলবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানো তালেবান যোদ্ধাদের আশ্রয়ও দিয়েছে পাকিস্তান। তবে সাম্প্রতিক বছরে পাকিস্তানের ভেতর হামলা বেড়ে যাওয়া নিয়ে আফগান তালেবান ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। টিটিপিকে বর্তমানে পাকিস্তানের ‘বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। গত এক বছরে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ৬০০-এর বেশি হামলা চালিয়েছে।


সীমান্তে আফগান সেনারা। ছবি: সংগৃহীত

মূলত এসব দ্বন্দের মাঝে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় ৯ অক্টোবর রাতে- যখন পাকিস্তানি বিমান বাহিনী আফগান রাজধানী কাবুলসহ কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, টিটিপির একাধিক আস্তানা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে- তবে প্রধান লক্ষবস্তু ছিলেন কাবুলে অবস্থানরত টিটিপির আমির।

তালেবান সরকার এটিকে আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে এবং ১১ ও ১২ অক্টোবর রাতে তালেবান যোদ্ধারা সীমান্তের একাধিক পাকিস্তানি সামরিক পোস্টে হামলা শুরু করে। হামলার পর তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করলে পাকিস্তানের সেনারাও বিমান হামলার সঙ্গে সিমান্তজুড়ে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। এ নিয়ে টানা কয়েকদিনের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের সেনাসহ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। এরপর কাতার, তুরস্ক ও কিছু আরব দেশের মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উভয় সীমান্তে উত্তেজনা রয়েই গেছে।

মিয়ানমার সংকট

অং সান সু চি পতন থেকে বর্তমানে জান্তা সরকারের নির্বাচন পর্যন্ত মিয়ানমারে বর্তমান বিশৃঙ্খলা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটি গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক সংকটে নিমজ্জিত। অভ্যুত্থানে সু চির সরকারকে উল্টে দিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে- যা গৃহযুদ্ধ, শরণার্থী সংকট এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি বিতর্কিত নির্বাচনের দিকে নিয়ে গেছে। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি দলের নেতৃত্বে ২০২০ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন নোবেলবিজয়ী সূচি। কিন্তু সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইং নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে সূচিকে গ্রেপ্তার এবং ক্ষমতা দখল করেন। জাতিসংঘসহ পশ্চিমা সরকারগুলো এটিকে ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সূচি এখন ২৭ বছরের সাজা ভোগ করছেন।


মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে বিমান হামলা, গ্রাম পোড়ানো এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা বেড়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

ধারণা করা হয়, এই অভ্যুত্থানের পর ১৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। পরবর্তীতে বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে। কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি, আরাকান আর্মি, তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের মতো সশস্ত্র দলগুলো জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। যুদ্ধে বিমান হামলা, গ্রাম পোড়ানো এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা বেড়ে যায়।

২০২৫ সালের বিভিন্ন হিসাবে ৩০ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে এবং ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাসিন্দা বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুসারে, এই গৃহযুদ্ধে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলেও জান্তা সরকার চলতি ডিসেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ের একটি নির্বাচন শুরু করেছে – ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটি অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন।