বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ৮ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত বকেয়া বিল পায়নি কোম্পানিগুলো। দীর্ঘদিন ধরে বিল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে। এমন অবস্থায় রমজান মাসের আগেই মোট বকেয়ার অন্তত: ৬০ শতাংশ পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মালিকরা।
গত সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব তথ্য তুলে ধরেন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা)। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি ডেভিড হাসনাত, সাবেক সভাপতি ইমরান করিম, পরিচালক নাভিদুল হক ও ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরে সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, বকেয়া বিলের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের চাপ মিলিয়ে এসব কোম্পানি ইতিমধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন ব্যয়
পরিচালনা ও জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে বাধ্য হয়ে উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, যা তাদের আর্থিক সক্ষমতাকে আরো দুর্বল করে তুলছে।
বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত রাখার আইনগত অধিকার রাখে। চুক্তির ১৩.২(জ) ধারা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যুৎ গ্রহণের অধিকারও স্থগিত হতে পারে। তবে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো কখনোই পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেনি। বিপুল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে সাধ্যমতো জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকরা অভিযোগ করে বলেন, বকেয়াজনিত আর্থিক সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যখন উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে, তখন জাতীয় লোড বণ্টন কেন্দ্রের মাধ্যমে বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাহিদা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণমূলক জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর দাবি, অপর্যাপ্ত সরবরাহ দেখিয়ে এই জরিমানা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কাগজে-কলমে বিপিডিবির বকেয়া কম দেখানো যায়। বর্তমানে কোনো কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে এই জরিমানার অর্থ বকেয়া বিল থেকে কর্তন করা হয়েছে এবং অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কর্তনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এই তথাকথিত জরিমানার মূল কারণ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের বিল পরিশোধে ব্যর্থতা, যার দায় অন্যায়ভাবে তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।
এই বকেয়া সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় ও বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপে ভিন্নতা থাকায় খাতে বৈষম্যের অভিযোগও উঠেছে।
বক্তব্যে সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, আমরা বকেয়ার টাকা না পেলে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারব না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও চালানো সম্ভব হবে না। এবার গ্রীষ্মে গত বছরের তুলনায় তাপমাত্রা বাড়বে, তাই বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা না গেলে লোডশেডিং করতে হবে। তাই রমজান মাসের আগেই আমাদেরকে মোট বকেয়ার ৬০ শতাংশ যাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে পারব।

























