ভালোবাসার প্রতীক টেডি বিয়ার। এটি মূলত একটি নরম খেলনা কার্টুন। টেডি বিয়ার প্রথমত শিশুদের খেলনা হিসেবে জয়প্রিয় হয়ে উঠলেও; ধীরে ধীরে তা ছোট-বড় সবার প্রিয় অনুসঙ্গ হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে নরম এই তুলতুলে কালো-গোল চোখের টেডি বিয়ারটি কিশোর-তরুণদের জীবনে ভিন্ন এক অর্থ নিয়ে আসে। একসময় মানুষ ভেবে দেখলো—ভালোবাসার ফুল শুকিয়ে যায়, চকলেট এ সময় ফুরিয়ে যায়—কিন্তু টেডি বিয়ার থেকে যায়। ফলে বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝিতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রেমের অন্যতম উপহার হিসেবে চালু হয় টেডি বিয়ার। সবাই চায় ভালোবাসার প্রথম উপহারটি স্মরণীয় করে রাখতে। কিন্তু ফুল-চকলেটের আয়ুশকাল বা স্থায়ীত্ব কম থাকার কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠে টেডি বিয়ার। যার স্থায়ীত্ব হতে পারে অনন্তকাল। ফলে ভালোবাসা দিবস, জন্মদিন কিংবা যে কোনো উত্সবে—প্রিয়জনের জন্য উত্কৃষ্ট উপহার হিসেবে উঠে আসে টেডি বিয়ার। যা ভালোবাসা এবং না বলা কথার অনুষঙ্গ হয়ে উঠে।
বহু খেলনার মাঝে টেডি বিয়ারেই কেন হলো ভালোবাসার প্রতীক?—মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে টেডির তুলতুলে নরম শরীর, কালো গোলাকার চোখের চাহনি আর অনুভূতিতে। টেডির পরশ মানুষকে আরাম দেয়, পাশে কেউ আছে সেই অনুভূতি দেয়; ঠিক যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে—প্রশান্তির মতো। অন্যদিকে টেডির কোনো বিচক্ষণতা নেই; আপনি হাসুন, কাঁদুন, রাগ করুন— সে সবকিছুই নির্বিচারে গ্রহণ করে। যেমনটা ভালোবাসার সম্পর্কেও হয়ে থাকে। টেডিকে বুকে চেপে নিলে হালকা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে, মনে হয় এই তো, কাউকে পেলাম। সে ছেলেবেলায় হোক কিংবা বড়বেলায় হোক। জীবনের কোনো একলা মুহূর্তে টেডি বিয়ার নিঃশব্দে পাশে দাঁড়ায়। তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না।
তবে আধুনিক সময়ে টেডি বিয়ার এখন আর শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষও টেডি বিয়ার রাখেন নিজের জন্য। কারণ টেডি বিয়ার একজন নিঃসঙ্গ মানুষকে মানসিক সাপোর্টও দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, নরম খেলনা স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করে। ফলে অনেকের বিছানার ছোট-বড় টেডি বিয়ার শোভা পায়। এই টেডি বিয়ার একজন বন্ধুর মতো নিশ্চুপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
টেডি বিয়ার খেলনার আছে এক শতবর্ষী আবেগঘন ইতিহাস। কীভাবে এই ‘খেলনা বিয়ার’ ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠল—সেটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ১৯০২ সালের কথা। সে সময়ের প্রেসিডেন্ট ‘থিওডোর রুজভেল্ট’, যাকে সবাই আদর করে ডাকত ‘টেডি’ নামে। কারণ তিনি শিকার করতে পছন্দ করতো। একবার অভিযানে যান মিসিসিপিতে, শিকারে সফল না হওয়ায়, তার সহকারীরা একটি ছোট ভালুক ধরে এনে প্রেসিডেন্টের সামনে হাজির করে, যেন তিনি সেটিকে গুলি করে মেরে শিকারের আনন্দটা নেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট রাজি হলেন না। তিনি জানালেন—‘এভাবে বন্দি প্রাণীকে হত্যা করা শিকারের নৈতিকতার পরিপন্থি’।
ঘটনাটি তখনকার পত্রিকায় কার্টুন হিসেবে ছাপা হয়— এক পাশে রাইফেলধারী প্রেসিডেন্ট, আর অন্য পাশে একটি ভীত ছোট ভালুক। এই কার্টুনই মানুষের মনে এমনভাবে দাগ কাটে যে—‘ইতিহাস বদলে দেয়’। কার্টুনটি দেখে অনুপ্রাণিত হন নিউইয়র্কের এক দোকানদার ‘মরিস মিচটম’। তিনি তার স্ত্রী রোজের সাহায্যে একটি ছোট ভালুকের নরম খেলনা তৈরি করে নেন এবং নাম দেন ‘টেডিস বিয়ার’। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুমতি নিয়েই নামটি ব্যবহার করেন ঐ দোকানি। সেই খেলনার দোকানে জন্ম নিল ‘টেডি বিয়ার’।
অবাক করা বিষয় হলো, খেলনাটি মুহূর্তেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও এই নরম তুলতুলে বাচ্চা ভালুকের প্রতি আকৃষ্ট হন। ধীরে ধীরে ‘টেডিস বিয়ার’ সংক্ষিপ্ত হয়ে যায় ‘টেডি বিয়ারে’। প্রায় একই সময়ে জার্মানিতেও ‘মার্গারেট স্টেইফ’ নামে একজন নারী নরম খেলনা বানাচ্ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠান ‘স্টেইফ’ তৈরি করেছিল প্রথম চলনসই হাত-পা বিশিষ্ট ভালুক। ফলে ইউরোপ-আমেরিকা দুই মহাদেশেই টেডি বিয়ারের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে।
আর জগত্ বিখ্যাত সেই টেডি বিয়ার শত বছর পরেও প্রাসঙ্গিক। কারণ টেডি বিয়ার আসলে শুধু খেলনা নয়। সে মানুষের এক গভীর অনুভূতির নাম, যা ‘ভালোবাসা পাওয়ার’। যে কারণে ভালোবাসার ভাষায় টেডি বিয়ারের নামটা কখনো সেই আগের মতোই। ডিজিটাল যুগেও টেডির আবেদন একটুও বদলায়নি। এখনো অনলাইন শপিং সাইটে টেডি বিয়ার অন্যতম বিক্রিত উপহার।

























