আসাদ গেটের পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন কখনো? মনে কি প্রশ্ন জেগেছে কে এই আসাদ? কী তার পরিচয়? তবে কবির কবিতায় আসাদ বেঁচে আছেন অন্যরকম দীপ্তিতে। শহিদ আসাদকে নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাটি লিখেছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান—‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো, কিংবা সূর্যাস্তের/ জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/ উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।/ বোন তার ভাইয়ের অম্লান শার্টে দিচ্ছে লাগিয়ে/ নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম, কখনো/ হৃদয়ের সোনালী তন্তুর সূক্ষ্মতায়।/ ‘বরেণ্যে কবি আল মাহমুদের শব্দমালায় এসেছে—‘ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে/ দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা/ তুলবো কেন খিল?/ আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ ফিরবে সে মিছিল।’ গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে হেলাল হাফিজের বিখ্যাত পঙক্তটি ছিল এমন— ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ মিছিলের সব হাত/ কণ্ঠ/ পা এক নয়।/ সেখানে সংসারি থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,/ কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার।’ এই কবিতাগুলো সে সময়কার আন্দোলনকে প্রচণ্ড বেগবান করেছিল এবং আসাদকে একটি অমর প্রতীকে পরিণত করেছিল। আসাদকে নিয়ে শুধু কবিতা নয়, তার গ্রামের মানুষ তাকে নিয়ে অনেক লোকসংগীত বা জারি গানও রচনা করেছে, যা স্থানীয়ভাবে আজও গাওয়া হয়।
শহিদ আসাদ হচ্ছে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক। তত্কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা শহিদ আসাদ (আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান)। ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধামুয়া গ্রামের হাতিরদিয়ায় জন্ম তার। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি স্বৈরাচার আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের হরতাল চলাকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে প্রথম শহিদ হন আসাদ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) গ্রুপ-এর নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি। পুলিশের গুলিতে আসাদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ছাত্র-জনতার মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তার মৃত্যুতে আন্দোলনের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠে। শহিদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে পরদিন রাজধানী ঢাকায় বের হয় স্মরণকালের বৃহত্তম শোক মিছিল। বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয় প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা। বিক্ষুব্ধ জনতা সেই সময়ই ছুটে যান মোহাম্মদপুরে নির্মিত তৎকালীন আইয়ুব গেটের সামনে এবং প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ প্রতীক হিসেবে আইয়ুব গেটের নামফলক গুঁড়িয়ে দিয়ে আসাদের রক্ত দিয়েই সেখানে ‘আসাদ গেট’ লিখে দিয়েছিল। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতীকী প্রতিবাদ। সেই থেকে বীরত্বের স্মারক হিসেবে নির্মিত মোহাম্মদপুর আসাদ গেটের জন্ম। শহিদ আসাদের স্মৃতি রক্ষার্থে জনতা শুধু আইয়ুব গেটের নামই পরিবর্তন করেনি, বরং তৎকালীন পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে পরিচিত ‘আইয়ুবনগর’-এর নামও বদলে ‘আসাদনগর’ রেখেছিল (যা বর্তমানে শেরেবাংলা নগর)। ঐ সময় আসাদের শার্ট হাতে নিয়ে জনতার দীর্ঘ মিছিল দেখে কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন তার সেই বিখ্যাত কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। যে কবিতা ছড়িয়ে গেছে সবখানে।
ইতিহাস বলে, ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের তত্কালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ঢাকায় এসে মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেট এলাকার প্রথম ১৫টি বাড়ি কিছু পরিবারের জন্য বরাদ্দ করেন। তখন সেই আবাসিক এলাকার প্রধান প্রবেশপথ হিসেবেই তোরণটি নির্মিত হয়েছিল এবং তার নামানুসারে এর নাম রাখা হয় ‘আইয়ুব গেট’।
শহিদ আসাদ ছিলেন অনেক দূরদর্শী। তিনি শুধু একজন ছাত্রনেতাই ছিলেন না, ছিলেন কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তার ডায়েরি থেকে জানা যায়, ১৯৬৮ সালে তিনি নরসিংদীর শিবপুরে দরিদ্র ও শ্রমিকদের জন্য একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন এবং শোষণমুক্ত একটি সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। আসাদ কেবল রাজনীতি নয়, আইন পেশায় যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ারও স্বপ্ন দেখতেন। এ লক্ষ্যেই তিনি সিটি ল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি একজন শিক্ষক হিসেবে মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও পোষণ করতেন। বর্তমানে তার স্মরণে শিবপুরে শহীদ আসাদ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ঐ এলাকার শিক্ষা প্রসারে ভূমিকা রাখছে।
আসাদের বাবা মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের ছিলেন বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং শিবপুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার ভাইয়েরা উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন এবং আসাদের এই রাজনৈতিক চেতনার প্রতি তাদের সমর্থন ছিল।
জানা যায়, নরসিংদীতে আসাদের পৈতৃক বাড়িটি এখনো রয়েছে। তার ব্যবহৃত অনেক স্মৃতিচিহ্ন পরিবার সযত্নে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। বাড়ির পাশেই একটি পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে।
তার এই অসামান্য আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করে।
স্মৃতিফলকে ছোট এক লাইনে শহিদ আসাদ সম্পর্কে লেখা ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শহীদ আসাদুজ্জামান।’ এছাড়া বিস্তারিত কিছু লেখা নেই।
শহিদ আসাদ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করা থাকলে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকে ছাত্রদের অবদান সম্পর্কে সবাই জানতে পারবে মন্তব্য করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাভেদ রহমান বলেন, আসাদ গেট নিয়ে আমিও বিস্তারিত জানি না। কেবল এইটুকু জানি দেশের জন্য তার অবদান আছে।
উল্লেখ্য, আসাদ গেটের তোরণটি ঢাকা জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিত হয়। তবে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এখন সিটি কর্পোরেশনের।


















