যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোন ‘নন-মার্কেট ইকোনমির’ সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে না। এর ফলে বাংলাদেশ চীন বা রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অন্য কোন ধরণের চুক্তি করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, এই শর্তের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ব্লক—রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (আরসিইপি)-এর সদস্য হওয়াও বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে, কারণ আরসিইপিতে চীন রয়েছে এবং এর সদস্য হতে হলে প্রত্যেকটি সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পৃথক চুক্তি করতে হবে।
তাছাড়া, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেভাবে এগুচ্ছে, তা সামনে আর সম্ভব হবে না।
আর এসব দেশের সঙ্গে কোনো রকম চুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের উপর প্রথম যে ৩৭ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিল, তা কার্যকর করবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বিশ্লেষণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান ও বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান এসব তথ্য জানান।
নন-মার্কেট ইকোনমি সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে: বাংলাদেশ যদি কোনো নন-মার্কেট ইকোনমির দেশের সঙ্গে নতুন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তিতে প্রবেশ করে এবং তা যদি এই চুক্তিকে ক্ষুণ্ন করে, তাহলে উদ্বেগ নিরসনে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে—যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে এবং ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল জারি করা নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্কহার পুনর্বহাল করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইতোমধ্যে যেসব দেশকে ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাদের তালিকায় চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি রয়েছে ভিয়েতনাম, বেলারুশ, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, মলদোভা, আজারবাইজানসহ আরও কয়েকটি দেশ।
রূপপুর প্রকল্পে প্রভাব
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে: বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয় করবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থকে বিপন্ন করে; তবে এমন ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে, যেখানে বিকল্প সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি নেই এমন মালিকানাধীন উপকরণ সংগ্রহ, অথবা এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় বিদ্যমান চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ।
এই ধারা সম্পর্কে মোস্তফা আবিদ বলেন, এই চুক্তির প্রভাব আমাদের রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর কতোটা পড়বে, তা নিয়েও চিন্তা রয়েছে। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে কোন চুক্তি স্বাক্ষর করে প্রয়োজনীয় কোন কিছু আমদানি করা যাবে না।
আমাদের হাত-পা বাধা পড়ে গেছে জানান মোস্তফা আবিদ।
বিনিয়োগে সম্ভাব্য প্রভাব
মো. হাফিজুর রহমান জানান, চুক্তিতে বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোন দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে, তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে কমে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে—ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি আরও জানান, এমনকী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা বিদেশি কোম্পানি—যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো দেশে মার্কেট রেটের তুলনায় কমদামে রপ্তানি করার কারণে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাতেও বাংলাদেশি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র।
হাফিজুর রহমান বলেন, এর ফলে চীনসহ অন্য দেশ থেকে যেসব বিনিয়োগকারী—কম উৎপাদন খরচের কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির চিন্তা করবে, তারাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হবে।
এক্ষেত্রে মার্কেট রেট বলতে কী বোঝায়—জানতে চাইলে ড. মোস্তফা আবিদ জানান, এক্ষেত্রে মার্কেট রেট যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করেছিল; তখন তারা মার্কেট রেট নির্ধারণ করেছিল উৎপাদন খরচের সঙ্গে ২০ শতাংশ প্রফিট মার্জিন যোগ করে।
রাজস্ব আদায়
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির ফলে দেশটিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানি বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানি করে উৎপাদিত তৈরি পোশাকে শূন্য রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান নিজেরা তুলা উৎপাদন করায় তাদের পক্ষে এ সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে না। এখানে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ দুটির তুলনায় এগিয়ে থাকবে।
চুক্তির আওতায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে সুবিধা পাবে।
এপ্রসঙ্গে হাফিজুর রহমান বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যগুলোর শুল্ক একসঙ্গে ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। এরমধ্যে শুল্ক বলতে শুধু কাস্টমস শুল্ক নয়—সম্পুরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক শুল্কও একইহারে কমবে। শুধু ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর থাকবে। এতে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ শিল্প কারখানাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হবে।
এ প্রসঙ্গে মোস্তফা আবিদ জানান, আমরা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এতগুলো পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ শুল্কছাড় দিয়ে ফেলেছি। আমাদের এইচএস কোডে যত পণ্য আছে, তার অল্প কয়েকটি বাদ দিয়ে—সকল ক্ষেত্রেই দেশটিকে সুবিধা দিয়েছি আমরা।
ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস বা মেধাস্বত্ব অধিকারের ক্ষেত্রে যে ১৩টি চুক্তি ও কনভেনশন বাংলাদেশকে স্বাক্ষর করতে হবে, তার সবগুলোই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মেধাস্বত্ব অধিকার-সংক্রান্ত চুক্তি ও কনভেনশনের বাইরে। ফলে এগুলো বাস্তবায়ন করা এবং অর্থনীতিকে এসব চুক্তির সঙ্গে অভিযোজিত করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সূত্র: টিবিএস

























