Dhaka ১০:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বারবার হোঁচট কোমলমতি ২ কোটি শিক্ষার্থীর

Reporter Name
  • Update Time : ০৪:২২:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১৩ Time View


বারবার হোঁচট খাচ্ছে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর কোমলমতি ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী। পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতি চার বছরে চার বার পরিবর্তনের ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে নতুন শিক্ষাক্রমটি বাতিল করে সরকার। পরিবর্তন হয় মূল্যায়ন পদ্ধতি।

বছরের আট মাস নতুন শিক্ষাক্রম পড়ে আসা শিক্ষার্থীদের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরীক্ষায় বসতে হয় আগের নিয়মে (সৃজনশীল)। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নতুন শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু ছিল। সরকার ২০২৭ সাল থেকে দেশের শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও আসবে বড় পরিবর্তন।

মধ্যখানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার জন্য বছরের শেষ সময়ে সম্প্রতি প্রস্তাব পাঠিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটাকে অতিরঞ্জিত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন শিক্ষাবিদরা। চার বছরে চার বার মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের উদ্যোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে অস্থিরতার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

অভিভাবকরা বলছেন, বছর বছর নতুন শিক্ষাপদ্ধতি চালু করায় তাদের সন্তানরা পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কীভাবে পড়তে হবে, কী প্রশ্ন আসবে, কী উত্তর লিখতে হবে তা বুঝে উঠতে হিমশিম অবস্থা তাদের। অনেকে বিষণ্নতায় ভুগছে। রাজধানীতে বসবাসকারী চতুর্থ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর মা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বার্ষিক পরীক্ষার আগে মেয়েকে পড়তে বসালেই কান্না করে দিত। অনেকক্ষণ ধরে পড়ে পাঁচটা লাইনও মুখস্ত করাতে পারেনি। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। মেয়েটা আমার মেন্টালি প্রেসারে (মানসিক চাপ)। বছর বছর পড়ালেখায় এমন পরিবর্তন হলে তো আসলেই মুশকিল।’ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের সমস্যা শিক্ষার্থীদের          পৃষ্ঠা ২ কলাম ৪

বারবার হোঁচট

১৬ পৃষ্ঠার পর

মানসিক স্বাস্থ্য ও পড়ালেখায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। হঠাত্ বেশি চাপ দেওয়া যাবে না। তাদের সাবলীলভাবে ধীরে ধীরে আবারও অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আর শিক্ষাক্রম ওলটপালটে শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত জটিল’ উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে যাতে এমন সমস্যায় পড়তে না হয়, সেজন্য লক্ষ্যনির্ভর শিক্ষাক্রম এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশন করার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা বলেন, এটা সত্য যে, একটা কারিকুলামে পড়তে পড়তে আরেকটাতে ফিরলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়বে। এক্ষেত্রে আমরা চাপ কমিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াতে পরামর্শ দেব। সিলেবাস কমানো যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা করা হবে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাত বার শিক্ষাক্রম বা শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে সরকার। প্রথম পাঁচ বার শিক্ষাক্রমের মূল থিম ঠিক রেখে ৫-১০ শতাংশ পরিবর্তন করা হয়েছিল। তবে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে আনা হয় বড়সড় পরিবর্তন। ঐ শিক্ষাক্রমটি ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামে পরিচিত। এ পদ্ধতি প্রণয়নের ৯ বছরের মাথায় ২০২১ সালে আবারও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনা হয়। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকার যে শিক্ষাক্রমটি প্রণয়ন করেছিল, তা আগের যে কোনো শিক্ষাপদ্ধতির চেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে। যার মূল কারণ এ পদ্ধতিতে কোনো পরীক্ষা ছিল না। ২০২২ সালে পাইলট প্রকল্পের পর ২০২৩ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়। অসন্তোষ থেকে আন্দোলনে নামেন অভিভাবকরা। তাদের দমাতে মামলা-হামলার পথে হাঁটে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালে নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্তরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এবং মাধ্যমিক স্তরে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে চালু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে চতুর্থ ও পঞ্চম এবং দশম শ্রেণিতে এটি চালু করার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তা আর চালু হতে দেয়নি।

প্রাথমিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা :বছরের একেবারে শেষ দিকে প্রাথমিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমন সিদ্ধান্তের পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, এতে করে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে বছরের শুরুতেই বই উত্সব হওয়ার তেমন কোনো সম্ভবনা থাকছে না। রাষ্ট্রকে মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হতে পারে।

নতুন করে ব্যাবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করার উদ্যোগ : এনসিটিবির শীর্ষ ঐ কর্মকর্তা বলেন, ‘নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এজন্য মন্ত্রণালয় এনসিটিবির মাধ্যমে মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রণয়নের কাজ শেষ করে ফেলেছে। নতুন এই পদ্ধতিতে দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম ছিল। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে সামষ্টিক মূল্যায়নে লিখিত পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যাবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। যা অতীতে কোনো সময়ই ছিল না। এমন পদ্ধতি কার্যকর করতে কোনো অসুবিধা নেই। একদিক থেকে ভালো। কারণ, এতে করে শিক্ষার্থী মৌখিক বা ভাইবা পরীক্ষা সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান লাভ করবে। কিন্তু এমন পদ্ধতির সংযোজন বছরের একেবারে শেষ দিকে করা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আগামী বছর ইলেকশন, রোজা ও বন্ধ বাদে শিক্ষকরা মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাস পাঠদানের সুযোগ পাবেন। শিক্ষার্থীরা এত অল্প সময়ের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। যা প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। জাতির ভবিষ্যত্ হিসেবে বিবেচিত ক্ষুদে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে ঝরে পড়তে পারে। সার্বিক পর্যালোচনায় চলতি বছরের শিক্ষা পদ্ধতি বহাল রাখাই প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘২০২৬ সালের নতুন মূল‍্যায়ন নির্দেশিকা মাত্র ছয় মাসের জন্য চালু করা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে অর্থের অপচয় হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কোনো সুফল আসবে না। উলটো শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়াবে এবং তারা আন্দোলনমুখী হবে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত পাঠদান কার্যক্রম ব‍্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত স্থগিত করে চলমান মূল‍্যায়ন চালু রাখা সমীচীন হবে।’



Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
.design-developed a { text-decoration: none; color: #000000; font-weight: 700;

বারবার হোঁচট কোমলমতি ২ কোটি শিক্ষার্থীর

Update Time : ০৪:২২:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫


বারবার হোঁচট খাচ্ছে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর কোমলমতি ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী। পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতি চার বছরে চার বার পরিবর্তনের ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে নতুন শিক্ষাক্রমটি বাতিল করে সরকার। পরিবর্তন হয় মূল্যায়ন পদ্ধতি।

বছরের আট মাস নতুন শিক্ষাক্রম পড়ে আসা শিক্ষার্থীদের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরীক্ষায় বসতে হয় আগের নিয়মে (সৃজনশীল)। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নতুন শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু ছিল। সরকার ২০২৭ সাল থেকে দেশের শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও আসবে বড় পরিবর্তন।

মধ্যখানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার জন্য বছরের শেষ সময়ে সম্প্রতি প্রস্তাব পাঠিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটাকে অতিরঞ্জিত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন শিক্ষাবিদরা। চার বছরে চার বার মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের উদ্যোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে অস্থিরতার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

অভিভাবকরা বলছেন, বছর বছর নতুন শিক্ষাপদ্ধতি চালু করায় তাদের সন্তানরা পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কীভাবে পড়তে হবে, কী প্রশ্ন আসবে, কী উত্তর লিখতে হবে তা বুঝে উঠতে হিমশিম অবস্থা তাদের। অনেকে বিষণ্নতায় ভুগছে। রাজধানীতে বসবাসকারী চতুর্থ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর মা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বার্ষিক পরীক্ষার আগে মেয়েকে পড়তে বসালেই কান্না করে দিত। অনেকক্ষণ ধরে পড়ে পাঁচটা লাইনও মুখস্ত করাতে পারেনি। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। মেয়েটা আমার মেন্টালি প্রেসারে (মানসিক চাপ)। বছর বছর পড়ালেখায় এমন পরিবর্তন হলে তো আসলেই মুশকিল।’ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের সমস্যা শিক্ষার্থীদের          পৃষ্ঠা ২ কলাম ৪

বারবার হোঁচট

১৬ পৃষ্ঠার পর

মানসিক স্বাস্থ্য ও পড়ালেখায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। হঠাত্ বেশি চাপ দেওয়া যাবে না। তাদের সাবলীলভাবে ধীরে ধীরে আবারও অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আর শিক্ষাক্রম ওলটপালটে শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত জটিল’ উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে যাতে এমন সমস্যায় পড়তে না হয়, সেজন্য লক্ষ্যনির্ভর শিক্ষাক্রম এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশন করার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা বলেন, এটা সত্য যে, একটা কারিকুলামে পড়তে পড়তে আরেকটাতে ফিরলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়বে। এক্ষেত্রে আমরা চাপ কমিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াতে পরামর্শ দেব। সিলেবাস কমানো যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা করা হবে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাত বার শিক্ষাক্রম বা শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে সরকার। প্রথম পাঁচ বার শিক্ষাক্রমের মূল থিম ঠিক রেখে ৫-১০ শতাংশ পরিবর্তন করা হয়েছিল। তবে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে আনা হয় বড়সড় পরিবর্তন। ঐ শিক্ষাক্রমটি ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামে পরিচিত। এ পদ্ধতি প্রণয়নের ৯ বছরের মাথায় ২০২১ সালে আবারও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনা হয়। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকার যে শিক্ষাক্রমটি প্রণয়ন করেছিল, তা আগের যে কোনো শিক্ষাপদ্ধতির চেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে। যার মূল কারণ এ পদ্ধতিতে কোনো পরীক্ষা ছিল না। ২০২২ সালে পাইলট প্রকল্পের পর ২০২৩ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়। অসন্তোষ থেকে আন্দোলনে নামেন অভিভাবকরা। তাদের দমাতে মামলা-হামলার পথে হাঁটে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালে নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্তরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এবং মাধ্যমিক স্তরে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে চালু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে চতুর্থ ও পঞ্চম এবং দশম শ্রেণিতে এটি চালু করার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তা আর চালু হতে দেয়নি।

প্রাথমিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা :বছরের একেবারে শেষ দিকে প্রাথমিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমন সিদ্ধান্তের পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, এতে করে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে বছরের শুরুতেই বই উত্সব হওয়ার তেমন কোনো সম্ভবনা থাকছে না। রাষ্ট্রকে মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হতে পারে।

নতুন করে ব্যাবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করার উদ্যোগ : এনসিটিবির শীর্ষ ঐ কর্মকর্তা বলেন, ‘নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এজন্য মন্ত্রণালয় এনসিটিবির মাধ্যমে মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রণয়নের কাজ শেষ করে ফেলেছে। নতুন এই পদ্ধতিতে দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম ছিল। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে সামষ্টিক মূল্যায়নে লিখিত পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যাবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। যা অতীতে কোনো সময়ই ছিল না। এমন পদ্ধতি কার্যকর করতে কোনো অসুবিধা নেই। একদিক থেকে ভালো। কারণ, এতে করে শিক্ষার্থী মৌখিক বা ভাইবা পরীক্ষা সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান লাভ করবে। কিন্তু এমন পদ্ধতির সংযোজন বছরের একেবারে শেষ দিকে করা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আগামী বছর ইলেকশন, রোজা ও বন্ধ বাদে শিক্ষকরা মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাস পাঠদানের সুযোগ পাবেন। শিক্ষার্থীরা এত অল্প সময়ের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। যা প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। জাতির ভবিষ্যত্ হিসেবে বিবেচিত ক্ষুদে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে ঝরে পড়তে পারে। সার্বিক পর্যালোচনায় চলতি বছরের শিক্ষা পদ্ধতি বহাল রাখাই প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘২০২৬ সালের নতুন মূল‍্যায়ন নির্দেশিকা মাত্র ছয় মাসের জন্য চালু করা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে অর্থের অপচয় হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কোনো সুফল আসবে না। উলটো শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়াবে এবং তারা আন্দোলনমুখী হবে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত পাঠদান কার্যক্রম ব‍্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত স্থগিত করে চলমান মূল‍্যায়ন চালু রাখা সমীচীন হবে।’