Dhaka ০৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নারীর স্বাধীনতা প্রশ্নে সংঘাত ও প্রতিরোধের বছর

Reporter Name
  • Update Time : ০১:১৮:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৬ Time View


২০২৫ সালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর অবস্থান নিয়ে এক গভীর দ্বন্দ্বের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আলোচিত হয় নারীর কমিশনের সুপারিশ, হেনস্তা করা হয় কমিশনের সদস্যদের এই বছর একদিকে যেমন নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বিদ্বেষের ভয়াবহ রূপ সামনে এসেছে, অন্যদিকে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধও নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতির নানা স্তরে নারীর প্রশ্নটি বছর জুড়েই ছিল উত্তপ্ত আলোচনার কেন্দ্রে।

‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা: ২০২৪ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিরীন পারভীন হকের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের আইন, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নারীদের প্রতি বৈষম্য পর্যালোচনা করে সংস্কারের সুপারিশ করা। অভিন্ন পারিবারিক আইন, সমান সম্পত্তির অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ প্রধান উদেষ্টার কাছে প্রদান করেন এপ্রিল মাসে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে ও নারী কমিশনের সদস্যদের কেন্দ্র করে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা শুরু হয়। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের নীরব অবস্থানে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নারী ও মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ সরকার কমিশনকে রক্ষা বা সমর্থনের কোনো অবস্থান নেয়নি।

নারী আসন নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জাতীয় সংসদে নারী আসন নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নারী অধিকারকর্মীরা। কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে তারা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের কোনো সুপারিশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গ্রহণ করেনি। নারী অধিকারকর্মীদের দেওয়া প্রস্তাবও উপেক্ষা করা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নারী অধিকারের বিষয়টি সবচেয়ে কম গুরুত্ব পেয়েছে।

গুরুত্ব পায়নি নারী কমিশনের সুপারিশ: নারী অধিকারকর্মী ও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচন করার সুপারিশ করেছিল। ঐকমত্য কমিশন এই সুপারিশ গ্রহণ করেনি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী নারী হলেও ঐকমত্য কমিশনে নারীর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। কমিশন নারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। তারা শুধু রাজনৈতিক দলের কথায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সহিংসতার লাগামহীন বাস্তবতা: ২০২৫ সালের শুরু থেকেই নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান ভয়াবহ ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০টি। ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের অভিযোগে দিনে গড়ে ১২টি মামলা হয়েছে-যা আগের বছরের একই সময়ের সমান। মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশ জুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ৮ মার্চেও থেমে থাকেনি সহিংসতা-গাজীপুর, ঠাকুরগাঁও ও কেরানীগঞ্জে শিশু ও নারীর ওপর ধর্ষণের ঘটনা জাতিকে নাড়া দেয়। এমনকি ২০১৬ সালে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির জামিনে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে আরো দুর্বল করে দেয়। আসকের তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর এই ১১ মাসে ৫৩২ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ২০৭ জন নারীকে স্বামী হত্যা করে। ঐ ১১ মাসে মোট ৭১১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়। এদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হন ১৭৬ জন। ধর্ষকের পর হত্যা করা হয় ৩৩ জনকে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ: বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ বিচারহীনতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচারের হার শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ভয়াবহ রকমের নিম্ন। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, ডিএনএ প্রতিবেদনে বিলম্ব এবং গুরুতর অপরাধেও আসামির জামিন সব মিলিয়ে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ধর্ষণ মামলায় তদন্ত ও বিচার সময় কমানোর ঘোষণা দিলেও, বাস্তবে আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

পোশাক, শরীর ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি: ২০২৫ সালে নারীর পোশাক ও উপস্থিতি ঘিরে একাধিক ঘটনা সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতাকে নগ্নভাবে সামনে আনে। অক্টোবরে ‘ওড়না কোথায়’ প্রশ্ন তুলে প্রকাশ্যে নারী হেনস্তার ঘটনা, বাসের হেলপারের দ্বারা পোশাক নিয়ে অপমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দ্বারা ছাত্রীর পোশাক নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য-এসব ঘটনা দেখায়, নারীর শরীর এখনো কমেনি নারীর প্রতি বিদ্বেষ সামাজিক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারী প্রতিকৃতিতে জুতাপেটা ও অশালীন আচরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়া ছিল এ বছরের সবচেয়ে প্রতীকী ও বেদনাদায়ক ঘটনা-যা নারীর প্রতি বিদ্বেষের রাজনৈতিক রূপকেই প্রকাশ করে।

ধর্ম, রাজনীতি ও নারীর অধিকার: নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলের দাবিতে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের ঘোষণা প্রমাণ করে, নারীর অধিকার প্রশ্নটি শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। কওমি উদ্যোক্তাদের সম্মেলনে নারী সাংবাদিককে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনাও একই ধারার প্রতিফলন। এই প্রেক্ষাপটে ইউএন উইমেনের প্রতিবেদন জানায়, বিশ্ব জুড়ে এক-চতুর্থাংশ দেশে নারীর অধিকার দুর্বল হয়েছে বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

আদিবাসী ও প্রান্তিক নারীর দ্বিগুণ ঝুঁকি: গাইবান্ধায় সাঁওতাল নারীর ওপর হামলা, খাগড়াছড়িতে মারমা কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও প্রাণহানি দেখিয়েছে-প্রান্তিক ও আদিবাসী নারীরা সহিংসতার দ্বিগুণ ঝুঁকিতে রয়েছেন। এখানে লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতিগত ও রাজনৈতিক বৈষম্য।

প্রতিরোধ ও অগ্রগতির আলোকরেখা: তবু ২০২৫ শুধুই অন্ধকারের নয়। রেকর্ডসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণে যুব উৎসব, ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’, তথ্য আপাদের আন্দোলন, জয়িতা উদ্যোক্তাদের প্রতিবাদ-এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে নারীরা নিপীড়নের বিপরীতে সংগঠিত হচ্ছেন। খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে ২ লাখ ৭৪ হাজার নারীর অংশগ্রহণ ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যদিও তৈরি পোশাক খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার তথ্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

২০২৫ সাল ছিল নারীর প্রশ্নে এক দ্বন্দ্বময় সময়-যেখানে সহিংসতা ও বিদ্বেষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। এই বছর দেখিয়েছে, নারীর অধিকার কোনো স্বয়ংক্রিয় অর্জন নয়; এটি প্রতিদিনের লড়াই। ইতিহাসের বিচারে ২০২৫ স্মরণীয় হয়ে থাকবে-একটি সমাজ কীভাবে নিজের অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছিল, আর সেই অন্ধকার ভেদ করে কীভাবে নারীর কন্ঠ আরো জোরালো হয়ে উঠেছিল।

ক্রীড়াঙ্গনে নারী সাফল্যে: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নানা কারণে আলোকিত আর আলোচিত ছিল ২০২৫ সাল। প্রথম বারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে আফঈদ্য খন্দকারের দল। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার কারণে একুশে পদক পায় নারী ফুটবল দল। ক্রিকেটে মেয়েরা বিশ্বকাপে খেলেছে। অন্যদিকে হকিতে অনুর্ধ্ব-১৮ দল ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে। জাতীয় খেলা কাবাডিতে প্রথম বারের মতো নারীদের বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ। এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে জ্যাভলিন থ্রোতে স্বর্ণ জিতে প্রথম বার ইতিহাসে নাম লেখান চৈতি রানী দেব। যৌন হয়রানি নিয়ে সরগরম ছিল মাঠের বাইরে।

 

 

 

 

 

 





Source link

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
.design-developed a { text-decoration: none; color: #000000; font-weight: 700;

নারীর স্বাধীনতা প্রশ্নে সংঘাত ও প্রতিরোধের বছর

Update Time : ০১:১৮:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫


২০২৫ সালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর অবস্থান নিয়ে এক গভীর দ্বন্দ্বের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আলোচিত হয় নারীর কমিশনের সুপারিশ, হেনস্তা করা হয় কমিশনের সদস্যদের এই বছর একদিকে যেমন নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বিদ্বেষের ভয়াবহ রূপ সামনে এসেছে, অন্যদিকে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধও নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতির নানা স্তরে নারীর প্রশ্নটি বছর জুড়েই ছিল উত্তপ্ত আলোচনার কেন্দ্রে।

‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা: ২০২৪ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিরীন পারভীন হকের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের আইন, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নারীদের প্রতি বৈষম্য পর্যালোচনা করে সংস্কারের সুপারিশ করা। অভিন্ন পারিবারিক আইন, সমান সম্পত্তির অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ প্রধান উদেষ্টার কাছে প্রদান করেন এপ্রিল মাসে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে ও নারী কমিশনের সদস্যদের কেন্দ্র করে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা শুরু হয়। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের নীরব অবস্থানে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নারী ও মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ সরকার কমিশনকে রক্ষা বা সমর্থনের কোনো অবস্থান নেয়নি।

নারী আসন নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জাতীয় সংসদে নারী আসন নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নারী অধিকারকর্মীরা। কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে তারা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের কোনো সুপারিশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গ্রহণ করেনি। নারী অধিকারকর্মীদের দেওয়া প্রস্তাবও উপেক্ষা করা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নারী অধিকারের বিষয়টি সবচেয়ে কম গুরুত্ব পেয়েছে।

গুরুত্ব পায়নি নারী কমিশনের সুপারিশ: নারী অধিকারকর্মী ও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচন করার সুপারিশ করেছিল। ঐকমত্য কমিশন এই সুপারিশ গ্রহণ করেনি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী নারী হলেও ঐকমত্য কমিশনে নারীর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। কমিশন নারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। তারা শুধু রাজনৈতিক দলের কথায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সহিংসতার লাগামহীন বাস্তবতা: ২০২৫ সালের শুরু থেকেই নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান ভয়াবহ ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০টি। ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের অভিযোগে দিনে গড়ে ১২টি মামলা হয়েছে-যা আগের বছরের একই সময়ের সমান। মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশ জুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ৮ মার্চেও থেমে থাকেনি সহিংসতা-গাজীপুর, ঠাকুরগাঁও ও কেরানীগঞ্জে শিশু ও নারীর ওপর ধর্ষণের ঘটনা জাতিকে নাড়া দেয়। এমনকি ২০১৬ সালে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির জামিনে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে আরো দুর্বল করে দেয়। আসকের তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর এই ১১ মাসে ৫৩২ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ২০৭ জন নারীকে স্বামী হত্যা করে। ঐ ১১ মাসে মোট ৭১১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়। এদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হন ১৭৬ জন। ধর্ষকের পর হত্যা করা হয় ৩৩ জনকে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ: বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ বিচারহীনতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচারের হার শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ভয়াবহ রকমের নিম্ন। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, ডিএনএ প্রতিবেদনে বিলম্ব এবং গুরুতর অপরাধেও আসামির জামিন সব মিলিয়ে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ধর্ষণ মামলায় তদন্ত ও বিচার সময় কমানোর ঘোষণা দিলেও, বাস্তবে আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

পোশাক, শরীর ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি: ২০২৫ সালে নারীর পোশাক ও উপস্থিতি ঘিরে একাধিক ঘটনা সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতাকে নগ্নভাবে সামনে আনে। অক্টোবরে ‘ওড়না কোথায়’ প্রশ্ন তুলে প্রকাশ্যে নারী হেনস্তার ঘটনা, বাসের হেলপারের দ্বারা পোশাক নিয়ে অপমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দ্বারা ছাত্রীর পোশাক নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য-এসব ঘটনা দেখায়, নারীর শরীর এখনো কমেনি নারীর প্রতি বিদ্বেষ সামাজিক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারী প্রতিকৃতিতে জুতাপেটা ও অশালীন আচরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়া ছিল এ বছরের সবচেয়ে প্রতীকী ও বেদনাদায়ক ঘটনা-যা নারীর প্রতি বিদ্বেষের রাজনৈতিক রূপকেই প্রকাশ করে।

ধর্ম, রাজনীতি ও নারীর অধিকার: নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলের দাবিতে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের ঘোষণা প্রমাণ করে, নারীর অধিকার প্রশ্নটি শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। কওমি উদ্যোক্তাদের সম্মেলনে নারী সাংবাদিককে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনাও একই ধারার প্রতিফলন। এই প্রেক্ষাপটে ইউএন উইমেনের প্রতিবেদন জানায়, বিশ্ব জুড়ে এক-চতুর্থাংশ দেশে নারীর অধিকার দুর্বল হয়েছে বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

আদিবাসী ও প্রান্তিক নারীর দ্বিগুণ ঝুঁকি: গাইবান্ধায় সাঁওতাল নারীর ওপর হামলা, খাগড়াছড়িতে মারমা কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও প্রাণহানি দেখিয়েছে-প্রান্তিক ও আদিবাসী নারীরা সহিংসতার দ্বিগুণ ঝুঁকিতে রয়েছেন। এখানে লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতিগত ও রাজনৈতিক বৈষম্য।

প্রতিরোধ ও অগ্রগতির আলোকরেখা: তবু ২০২৫ শুধুই অন্ধকারের নয়। রেকর্ডসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণে যুব উৎসব, ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’, তথ্য আপাদের আন্দোলন, জয়িতা উদ্যোক্তাদের প্রতিবাদ-এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে নারীরা নিপীড়নের বিপরীতে সংগঠিত হচ্ছেন। খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে ২ লাখ ৭৪ হাজার নারীর অংশগ্রহণ ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যদিও তৈরি পোশাক খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার তথ্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

২০২৫ সাল ছিল নারীর প্রশ্নে এক দ্বন্দ্বময় সময়-যেখানে সহিংসতা ও বিদ্বেষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। এই বছর দেখিয়েছে, নারীর অধিকার কোনো স্বয়ংক্রিয় অর্জন নয়; এটি প্রতিদিনের লড়াই। ইতিহাসের বিচারে ২০২৫ স্মরণীয় হয়ে থাকবে-একটি সমাজ কীভাবে নিজের অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছিল, আর সেই অন্ধকার ভেদ করে কীভাবে নারীর কন্ঠ আরো জোরালো হয়ে উঠেছিল।

ক্রীড়াঙ্গনে নারী সাফল্যে: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নানা কারণে আলোকিত আর আলোচিত ছিল ২০২৫ সাল। প্রথম বারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে আফঈদ্য খন্দকারের দল। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার কারণে একুশে পদক পায় নারী ফুটবল দল। ক্রিকেটে মেয়েরা বিশ্বকাপে খেলেছে। অন্যদিকে হকিতে অনুর্ধ্ব-১৮ দল ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে। জাতীয় খেলা কাবাডিতে প্রথম বারের মতো নারীদের বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ। এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে জ্যাভলিন থ্রোতে স্বর্ণ জিতে প্রথম বার ইতিহাসে নাম লেখান চৈতি রানী দেব। যৌন হয়রানি নিয়ে সরগরম ছিল মাঠের বাইরে।

 

 

 

 

 

 





Source link