আর মাত্র একদিন পরেই বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এখন চলছে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠ প্রশাসনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তবে, অতীতের মতো এবারও নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ হতে পারে বলে নানা মহলে এক ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য এবার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কোনো প্রকার হুমকি ছাড়াই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তত্কালীন ডিসিদের অনেককেই ওএসডি বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এর মধ্যে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৩ জন সাবেক ডিসিকে ওএসডি করা হয়। এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে ১২ জনকে ওএসডি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বর্তমান ডিসিরা বলছেন—তারা সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চান না। একাধিক জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমে তারা এবার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চান।
এদিকে, ঢাকার একটি আসন থেকে বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য অভিযোগ করেছেন, সরকারে থাকা একটি মহল নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ চেষ্টা করছে। আবার জামায়াত জোটের অন্যতম সঙ্গী এনসিপির এক নেতাও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ করেছেন। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকরা বলেছেন, এবার কোনোভাবেই ফলাফল পরিবর্তনের সুযোগ নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জেলা প্রশাসক বলেন, নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ভোটারদের ভয়ভীতি দূর করতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবার সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টা প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা গত ৩ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, মানুষের ভোটাধিকার রাষ্ট্রের আমানত, এই আমানতের প্রতি কোনো ধরনের বেইমানি বরদাশত করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো দুষ্কৃতিকারী বা সন্ত্রাসী যদি নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করে, প্রশাসন তা কঠোরভাবে প্রতিহত করবে। এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই যে কোনো স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছাতে পারে।
জনপ্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (বিএএসএ) অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে সংগঠনের সভাপতি কানিজ মওলা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিক বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, এবারের নির্বাচনটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতের কয়েকটি নির্বাচন আমাদের বিতর্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এই দুর্নাম থেকে আমাদের মুক্ত হতে হলে একটা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে হবে। আর এই চ্যালেঞ্জটা সুন্দরভাবে উত্তীর্ণ হতে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে কয়েকটি নির্বাচনে যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল, তাদের শাস্তি হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক এই আমলা বলেন, আমি মনে করি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের নির্বাচনে কর্মকর্তারা আর দুষ্টামি করবে না।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে গত রবিবার থেকে সারা দেশে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনি এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবেন। একইসঙ্গে নির্বাচনি অপরাধ প্রতিরোধ ও আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণে মাঠে থাকবেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তারা বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।




















