Dhaka ০১:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাত শেষ হলেই ভোটের উৎসব

Reporter Name
  • Update Time : ০১:৫৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৪ Time View


রাত শেষ হলেই আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট উৎসব। জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ইতিমধ্যে গণভোটের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন কেবল ভোটের জন্য অপেক্ষা। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটবঞ্চিতরা ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য মুখিয়ে আছেন। নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। তারপরও নানাভাবে অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা, অনলাইন ক্যাম্পেইন এবং পোলিং এজেন্ট চূড়ান্ত করার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন প্রার্থীরা। জয়-পরাজয়ের চুলচেলা বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্রই। কারা ক্ষমতাসীন হচ্ছেন বিএনপি নাকি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট? তবে বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিএনপি এবার এগিয়ে আছে। ভোটের মাঠে কালো টাকা বিতরণ এবং জালিয়াতির আশঙ্কা করেছে বিএনপি।

এবার নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। এর পাশাপাশি নির্বাচন উপলক্ষ্যে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে সাড়ে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে সারা দেশে একযোগে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তার আগেই আজ বুধবারের মধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার ও অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী পৌঁছানো হবে।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময় শেষ হলেও প্রার্থীরা অনলাইনে প্রচারণা চালাতে পারবেন এবং এতে আচরণ বিধি ভঙ্গ হবে না। তিনি জানান, একটি আসনে ভোট স্থগিত থাকায় এবার ২৯৯ আসনে ভোট হবে। ভোটের দিন ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় সাড়ে ৪টার পর কেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে কোনো ভোটার থাকলে তাদেরও ভোট নেওয়া হবে।

এদিকে, নির্বাচন সামনে রেখে টাকার বিনিময়ে ভোট বিক্রি ঠেকাতে ভোটারদের টাকা বিতরণ করলে ছয় মাসের জেল এবং দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রেখেছে ইসি। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হলেও প্রার্থীরা অনলাইনে প্রচারণা চালালে তাতে কোনো প্রকার আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে না বলেও জানিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ভোটকেন্দ্রে ভোটার, প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ ইনচার্জ, নির্বাচনি ডাটা সংরক্ষণে নিয়োজিত দুই জন আনসার সদস্য এবং সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না বলে নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। এক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ অন্য কর্মকর্তারাও ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, এবার নির্বাচনে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছে ৮১ জন। মোট ৪২ হাজার ৬৫৯ কেন্দ্রে স্বশরীরে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর আনুমানিক ৫০ শতাংশ সাধারণ ও বাকি ৫০ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। তিনি বলেন, পোস্টাল ভোট আজ সকাল পর্যন্ত ৭ লাখ ৩০ হাজার পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আছে ৯ লাখ ৫৮ হাজার। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডিউটি ২ হাজার ১০০ জন। ৯৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি আরো বলেন, ভোট পর্যবেক্ষণে ড্রোন, বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকছে। নজরদারি নিশ্চিতে ৯০ ভাগের বেশি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা আছে। পোলিং অফিসার থাকবে ৫ লক্ষাধিক। পোলিং সেন্টারে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি সামগ্রী কাল (আজ বুধবার) থেকে বিতরণ শুরু হবে, সন্ধ্যা নাগাদ কেন্দ্রে চলে যাবে। বডি ওর্ন ক্যামেরার ফিড ইসির কাছে থাকবে। যেখানে ইসির ক্রিটিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেখানে এ ফিড প্রয়োজন হবে। তাছাড়া প্রথম বারের মতো ড্রোন (ইউএভি) ব্যবহার ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকবে বলেও জানান তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আমরা সন্তুষ্ট। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা না ঘটলে পরিস্থিতি আরো ভালো হতো। তবে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় আমরা ভালো অবস্থানে আছি।’ নির্বাচন কমিশনার বলেন, গত দুই মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৮৫০টির বেশি অস্ত্র উদ্ধার করেছে, যা সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর পোস্টাল ভোটের জন্য ইতিমধ্যে ৭ লাখ ৩ হাজার ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট ব্যালট সময়মতো পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এক প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বলেন, আসন্ন নির্বাচনে ব্যবহূত হবে দুটি আলাদা ব্যালট। একটি সাদা ব্যালট যেটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালটটি  গণভোটের। দুটি ব্যালটের ফলাফল একসঙ্গে গণনা ও প্রকাশ করা হবে, যাতে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি না হয়।

ভোটে ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক ও ১০ হাজার সাংবাদিক :এবারের নির্বাচনে ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক ও প্রায় ১০ হাজার সাংবাদিক নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে দেশীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৪৫ হাজার ৩৩০ জন, বিদেশি পর্যবেক্ষক প্রায় ৩৫০ জন ও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিক ৯ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন বলে জানান ইসি সানাউল্লাহ।

ইসি জানিয়েছে, নির্বাচনে বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়মের কারণে এখন পর্যন্ত ৩০০টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া ৫০০টির বেশি তদন্ত শেষ করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে প্রচারণা চালালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারবেন, তবে গোপন কক্ষে প্রবেশ নিষিদ্ধ, লাইভ সম্প্রচার নিষিদ্ধ, ভোটার সাক্ষাত্কার গ্রহণ নিষিদ্ধ ভোটারদের জন্য গোপন কক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার ও নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন সম্পন্ন করতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ভোটের দিনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটের দিন ব্রিফিং হবে মোট চার বার। সংসদীয় আসন ও গণভোটের ফলাফল একসঙ্গে গণনা হবে। বেশির ভাগ ফলাফল রাতেই পাওয়া যাবে। পুরো দেশের ভোটের ওপর মেজরিটির ভিত্তিতে গণভোটের ফলাফল দেওয়া হবে। ভোটার টার্নআউট ভালো হবে বলে আশা করেন তিনি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফলাফলের জন্য তাড়াহুড়ো করা যাবে না। প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটে শতাধিক প্রতীক থাকবে। এতে গণনায় একটু বেশি সময় লাগবে। কালো টাকার ছড়াছড়ির ব্যাপারে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) আমরা সতর্ক নজর রাখতে বলেছি।

ভোটের মাঠে ৫১টি দল :ইসির তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দলটির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৯১ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ জন প্রার্থী শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন।

ভোটারদের টাকা বিতরণ করলে ছয় মাসের জেল :ভোটগ্রহণের আগে কোনো  প্রার্থী বা দলের পক্ষে যে কেনো ব্যক্তি গোপন প্রচার বা টাকা বিতরণের মতো কাজ করলে হতে পারে ছয় মাসের জেল ও ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। গতকাল মঙ্গলবার ইসি কর্মকর্তারা বিষয়টি জানিয়েছেন।

নির্বাচনী আচরণবিধির ৪(১) উপবিধিতে বলা হয়েছে, ‘কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী কিংবা তাহার পক্ষ হইতে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন-পূর্ব সময়ে উক্ত প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা উক্ত এলাকা বা অন্যত্র অবস্থিত কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো প্রকার চাঁদা বা অনুদান বা উপঢৌকন প্রদান করিতে বা প্রদানের অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি প্রদান করিতে পারিবেন না।’ অন্যদিকে বিধি ২৭-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচন পূর্ব সময়ে এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ডে অথবা অনধিক ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন। এদিকে কিছু কিছু কারণে প্রার্থিতাও বাতিল করতে পারে কমিশন। আচরণবিধির ২৮ (১) উপবিধিতে বলা হয়েছে, ‘এই বিধিমালার অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, যদি কোনো উত্স হইতে প্রাপ্ত রেকর্ড কিংবা লিখিত রিপোর্ট হইতে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী বা তাহার নির্বাচনী এজেন্ট এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করিয়াছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করিয়াছেন এবং অনুরূপ লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের চেষ্টার জন্য তিনি নির্বাচিত হইবার অযোগ্য হইতে পারেন, তাহা হইলে কমিশন বিষয়টি সম্পর্কে তাত্ক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, (১) এর অধীন তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির পর কমিশন যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাহার নির্বাচনী এজেন্ট বা তাহার নির্দেশে বা তাহার পক্ষে তাহার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতিতে অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করিয়াছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করিয়াছেন যাহার জন্য তিনি নির্বাচিত হইবার অযোগ্য হইতে পারেন, তাহা হইলে কমিশন তাত্ক্ষণিকভাবে লিখিত আদেশ দ্বারা উক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করিতে পারিবে।’ ভোটের আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিতে মাঠে নিয়োজিত আছে নির্বাহী হাকিম, বিচারিক হাকিম ও নির্বাচনি তদন্ত কমিটির বিচারকরা। তারা তাত্ক্ষণিক শাস্তি দিতে পারেন।





Source link

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
.design-developed a { text-decoration: none; color: #000000; font-weight: 700;

রাত শেষ হলেই ভোটের উৎসব

Update Time : ০১:৫৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


রাত শেষ হলেই আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট উৎসব। জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ইতিমধ্যে গণভোটের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন কেবল ভোটের জন্য অপেক্ষা। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটবঞ্চিতরা ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য মুখিয়ে আছেন। নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। তারপরও নানাভাবে অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা, অনলাইন ক্যাম্পেইন এবং পোলিং এজেন্ট চূড়ান্ত করার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন প্রার্থীরা। জয়-পরাজয়ের চুলচেলা বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্রই। কারা ক্ষমতাসীন হচ্ছেন বিএনপি নাকি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট? তবে বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিএনপি এবার এগিয়ে আছে। ভোটের মাঠে কালো টাকা বিতরণ এবং জালিয়াতির আশঙ্কা করেছে বিএনপি।

এবার নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। এর পাশাপাশি নির্বাচন উপলক্ষ্যে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে সাড়ে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে সারা দেশে একযোগে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তার আগেই আজ বুধবারের মধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার ও অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী পৌঁছানো হবে।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময় শেষ হলেও প্রার্থীরা অনলাইনে প্রচারণা চালাতে পারবেন এবং এতে আচরণ বিধি ভঙ্গ হবে না। তিনি জানান, একটি আসনে ভোট স্থগিত থাকায় এবার ২৯৯ আসনে ভোট হবে। ভোটের দিন ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় সাড়ে ৪টার পর কেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে কোনো ভোটার থাকলে তাদেরও ভোট নেওয়া হবে।

এদিকে, নির্বাচন সামনে রেখে টাকার বিনিময়ে ভোট বিক্রি ঠেকাতে ভোটারদের টাকা বিতরণ করলে ছয় মাসের জেল এবং দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রেখেছে ইসি। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হলেও প্রার্থীরা অনলাইনে প্রচারণা চালালে তাতে কোনো প্রকার আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে না বলেও জানিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ভোটকেন্দ্রে ভোটার, প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ ইনচার্জ, নির্বাচনি ডাটা সংরক্ষণে নিয়োজিত দুই জন আনসার সদস্য এবং সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না বলে নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। এক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ অন্য কর্মকর্তারাও ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, এবার নির্বাচনে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছে ৮১ জন। মোট ৪২ হাজার ৬৫৯ কেন্দ্রে স্বশরীরে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর আনুমানিক ৫০ শতাংশ সাধারণ ও বাকি ৫০ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। তিনি বলেন, পোস্টাল ভোট আজ সকাল পর্যন্ত ৭ লাখ ৩০ হাজার পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আছে ৯ লাখ ৫৮ হাজার। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডিউটি ২ হাজার ১০০ জন। ৯৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি আরো বলেন, ভোট পর্যবেক্ষণে ড্রোন, বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকছে। নজরদারি নিশ্চিতে ৯০ ভাগের বেশি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা আছে। পোলিং অফিসার থাকবে ৫ লক্ষাধিক। পোলিং সেন্টারে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি সামগ্রী কাল (আজ বুধবার) থেকে বিতরণ শুরু হবে, সন্ধ্যা নাগাদ কেন্দ্রে চলে যাবে। বডি ওর্ন ক্যামেরার ফিড ইসির কাছে থাকবে। যেখানে ইসির ক্রিটিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেখানে এ ফিড প্রয়োজন হবে। তাছাড়া প্রথম বারের মতো ড্রোন (ইউএভি) ব্যবহার ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকবে বলেও জানান তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আমরা সন্তুষ্ট। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা না ঘটলে পরিস্থিতি আরো ভালো হতো। তবে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় আমরা ভালো অবস্থানে আছি।’ নির্বাচন কমিশনার বলেন, গত দুই মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৮৫০টির বেশি অস্ত্র উদ্ধার করেছে, যা সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর পোস্টাল ভোটের জন্য ইতিমধ্যে ৭ লাখ ৩ হাজার ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট ব্যালট সময়মতো পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এক প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বলেন, আসন্ন নির্বাচনে ব্যবহূত হবে দুটি আলাদা ব্যালট। একটি সাদা ব্যালট যেটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালটটি  গণভোটের। দুটি ব্যালটের ফলাফল একসঙ্গে গণনা ও প্রকাশ করা হবে, যাতে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি না হয়।

ভোটে ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক ও ১০ হাজার সাংবাদিক :এবারের নির্বাচনে ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক ও প্রায় ১০ হাজার সাংবাদিক নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে দেশীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৪৫ হাজার ৩৩০ জন, বিদেশি পর্যবেক্ষক প্রায় ৩৫০ জন ও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিক ৯ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন বলে জানান ইসি সানাউল্লাহ।

ইসি জানিয়েছে, নির্বাচনে বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়মের কারণে এখন পর্যন্ত ৩০০টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া ৫০০টির বেশি তদন্ত শেষ করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে প্রচারণা চালালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারবেন, তবে গোপন কক্ষে প্রবেশ নিষিদ্ধ, লাইভ সম্প্রচার নিষিদ্ধ, ভোটার সাক্ষাত্কার গ্রহণ নিষিদ্ধ ভোটারদের জন্য গোপন কক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার ও নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন সম্পন্ন করতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ভোটের দিনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটের দিন ব্রিফিং হবে মোট চার বার। সংসদীয় আসন ও গণভোটের ফলাফল একসঙ্গে গণনা হবে। বেশির ভাগ ফলাফল রাতেই পাওয়া যাবে। পুরো দেশের ভোটের ওপর মেজরিটির ভিত্তিতে গণভোটের ফলাফল দেওয়া হবে। ভোটার টার্নআউট ভালো হবে বলে আশা করেন তিনি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফলাফলের জন্য তাড়াহুড়ো করা যাবে না। প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটে শতাধিক প্রতীক থাকবে। এতে গণনায় একটু বেশি সময় লাগবে। কালো টাকার ছড়াছড়ির ব্যাপারে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) আমরা সতর্ক নজর রাখতে বলেছি।

ভোটের মাঠে ৫১টি দল :ইসির তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দলটির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৯১ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ জন প্রার্থী শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন।

ভোটারদের টাকা বিতরণ করলে ছয় মাসের জেল :ভোটগ্রহণের আগে কোনো  প্রার্থী বা দলের পক্ষে যে কেনো ব্যক্তি গোপন প্রচার বা টাকা বিতরণের মতো কাজ করলে হতে পারে ছয় মাসের জেল ও ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। গতকাল মঙ্গলবার ইসি কর্মকর্তারা বিষয়টি জানিয়েছেন।

নির্বাচনী আচরণবিধির ৪(১) উপবিধিতে বলা হয়েছে, ‘কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী কিংবা তাহার পক্ষ হইতে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন-পূর্ব সময়ে উক্ত প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা উক্ত এলাকা বা অন্যত্র অবস্থিত কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো প্রকার চাঁদা বা অনুদান বা উপঢৌকন প্রদান করিতে বা প্রদানের অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি প্রদান করিতে পারিবেন না।’ অন্যদিকে বিধি ২৭-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচন পূর্ব সময়ে এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ডে অথবা অনধিক ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন। এদিকে কিছু কিছু কারণে প্রার্থিতাও বাতিল করতে পারে কমিশন। আচরণবিধির ২৮ (১) উপবিধিতে বলা হয়েছে, ‘এই বিধিমালার অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, যদি কোনো উত্স হইতে প্রাপ্ত রেকর্ড কিংবা লিখিত রিপোর্ট হইতে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী বা তাহার নির্বাচনী এজেন্ট এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করিয়াছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করিয়াছেন এবং অনুরূপ লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের চেষ্টার জন্য তিনি নির্বাচিত হইবার অযোগ্য হইতে পারেন, তাহা হইলে কমিশন বিষয়টি সম্পর্কে তাত্ক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, (১) এর অধীন তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির পর কমিশন যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাহার নির্বাচনী এজেন্ট বা তাহার নির্দেশে বা তাহার পক্ষে তাহার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতিতে অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করিয়াছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করিয়াছেন যাহার জন্য তিনি নির্বাচিত হইবার অযোগ্য হইতে পারেন, তাহা হইলে কমিশন তাত্ক্ষণিকভাবে লিখিত আদেশ দ্বারা উক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করিতে পারিবে।’ ভোটের আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিতে মাঠে নিয়োজিত আছে নির্বাহী হাকিম, বিচারিক হাকিম ও নির্বাচনি তদন্ত কমিটির বিচারকরা। তারা তাত্ক্ষণিক শাস্তি দিতে পারেন।





Source link