দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব রাজনীতিতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য প্রভাব
১৭ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে দেশে ফেরেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশে ফেরার সাত সপ্তাহের মাথায় অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে দল নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বলে বেসরকারি ফলে দেখা গেছে। এতে তিনি সরকারপ্রধান হওয়ার পথে রয়েছেন।
জানুয়ারিতে মার্কিন সাময়িকী টাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, এরপর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরানো এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা।
জাতীয় ঐক্য ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতায় বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গুমসহ নানা অভিযোগও সামনে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে সমঝোতার রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিভাজন নয়, ঐক্যই স্থিতিশীলতার পথ।
প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কাঠামোর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও কার্যকর করার বিষয়টিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
গত এক দশকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, টাকার মান কমে যাওয়া এবং বেকারত্ব পরিস্থিতিকে চাপে ফেলেছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্বের হার দুই অঙ্কে রয়েছে।
দলীয় ইশতেহারে ‘পরিবার কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে নারী ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত সংস্কার, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং ভারত বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তি। তাই এই দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভবিষ্যৎ নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিi নির্বাচনের পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আগের সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত কিছু চুক্তি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে ১৯ শতাংশে নেমে আসে। বাণিজ্য ও বাজার প্রবেশাধিকার প্রশ্ন ভবিষ্যৎ কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
ইসলামপন্থি দল ও সংসদীয় রাজনীতি
এ নির্বাচনে বিএনপির পর বেশি আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে দলটি নিষিদ্ধ ছিল। আগে বিএনপি ও জামায়াত জোট করে সরকার গঠন করেছিল। এবার বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সংসদে জামায়াত শক্তিশালী বিরোধী ভূমিকা রাখতে পারে।
তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দলকে দেশের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে অতীতের অস্থির পরিস্থিতিতে দেশ আর না ফেরে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
সাম্প্রতিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তারা পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়। আন্দোলনে নিহতদের বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশ হিসেবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর একটি হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। অভ্যন্তরীণ সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং ভারত–যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে তারেক রহমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে জাতীয় ঐক্য রক্ষা, অর্থনীতি স্থিতিশীল করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ওপরই তাঁর সাফল্যের পরিধি নির্ভর করবে।

























