Dhaka ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে পানির সংকট

Reporter Name
  • Update Time : ১২:১৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৩ Time View


লবণাক্ততার কারণে বিগত কয়েক বৎসর ধরিয়া প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সংগ্রহ করিতে পারিতেছে না চট্টগ্রাম ওয়াসা। হালদা ও কর্ণফুলী নদী হইতে পানি লইবার পর পরিশোধনের মাধ্যমে উহা নগরে সরবরাহ করিয়া থাকে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে সমুদ্রের পানি নদীতে ঢুকিয়া পড়িতেছে এবং সেই কারণে ওয়াসার পানিতে লবণের মাত্রাও ক্রমশ বাড়িতেছে। ফলে পানির উৎপাদন কমিয়া যাওয়ায় দিনের পরদিন পানি পাইতেছে না বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। আবার যেইটুকু পাইতেছে, লবণাক্ততার কারণে সেইটুকুও মুখে তুলিবার উপায় নাই। কর্তৃপক্ষ বিকল্প উপায়ের তালাশ করিতেছেন বটে; কিন্তু পানির সংকট বিশেষত রোজাব্রত মানুষের ভোগান্তি চরমভাবে বাড়াইয়া তুলিয়াছে। গত বৎসর রমজানেও একই চিত্র লক্ষ করা গিয়াছিল।

জানা যায়, পানি সংগ্রহের প্রশ্নে চট্টগ্রাম ওয়াসার একমাত্র ভরসা এই কাপ্তাই হ্রদ। এই হ্রদ হইতে পানি আসিয়া প্রথমে কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে পড়ে। তবে মুশকিল হইল, স্বাভাবিক অবস্থায় হ্রদে পানির স্তর ১০৯ ফুট পর্যন্ত থাকিলেও সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে তাহা ক্রমশ নামিয়া যাইতেছে। বিশেষ করিয়া, গ্রীষ্মের শুরুতে হ্রদের বিভিন্ন জায়গায় পানি কমিয়া যায়। ইহার ফলে নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, মৎস্য উৎপাদন ও পর্যটনে ক্ষতির পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন যেমন হ্রাস পায়, তেমনি তৈরি হয় ওয়াসার পানির সংকট। আর ইহার প্রভাব পড়ে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাপনে।

পানিতে অতিরিক্ত লবণের কারণে উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি কিডনি ও চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে—চিকিৎসকদের এমন আশঙ্কার মুখে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিকল্প স্থান হইতে পানি সংগ্রহ করিয়া সরবরাহ স্বাভাবিক রাখিবার জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ একটি নূতন পানি শোধনাগার প্রকল্প নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করিয়াছে, যাহা হইতে দৈনিক ৬৩ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করা যাইবে। শুষ্ক মৌসুমের সংকট কাটাইতে এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার নিরিখে ইহা সময়োপযোগী উদ্যোগ বটে। জানা যায়, ‘লবণাক্ততা পরিহারের লক্ষ্যে মোহরা পানি শোধনাগারের ইনটেক স্থানান্তর এবং উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ নামক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হইলে ২০৪২ সালে গিয়াও নগরীতে পানির বর্ধিত চাহিদা মিটানো সম্ভব হইবে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৯ সালে এই প্রকল্প শেষ করিবার লক্ষ্য ছিল ওয়াসার। তবে এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরুই করা যায় নাই। বিপদ বুঝিয়াও আগাম ব্যবস্থা গ্রহণে এই অনীহা কেন?

চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তাদের হিসাব মতে, বর্তমানে এই নগরীতে পানির দৈনিক চাহিদা ৫৮ কোটি লিটার, যাহা ২০৩২ সালে ৭৫ কোটি এবং ২০৪২ সালে ১০০ কোটি লিটার ছাড়াইয়া যাইবে। পানির এই বিশাল চাহিদা এবং তাহার বিপরীতে উদ্ভূত সংকট মিটাইতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ লওয়া হইবে বলিয়া জানাইয়াছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এমনকি লবণাক্ততার সমস্যা দ্রুত সমাধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জোয়ারের পানি আটকাইবার জন্য রেগুলেটর নির্মাণের প্রয়োজনের কথাও বলিতেছেন অনেকে। এখন প্রয়োজন কেবল এই সকল উদ্যোগের সফল ও ত্বরিত বাস্তবায়ন।

চিকিৎসকদের পরামর্শ হইল, খাওয়ার পানিতে সর্বোচ্চ ১৪৫ মিলিগ্রাম সোডিয়াম বা লবণ থাকা স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘদিন ধরিয়া ইহার অধিক পরিমাণে সোডিয়ামযুক্ত পানি পান ও ব্যবহার করিলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হইতে পারে। বিশেষ করিয়া, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা ইহাতে বেকায়দায় পড়িয়া যাইবেন। সুতরাং, কাপ্তাই হ্রদের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি আমলে লইয়া বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা অতি জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। প্রায় প্রতি বৎসরই লবণাক্ততার জন্য সীমাহীন ভোগান্তি পোহাইতে হইলেও কর্তৃপক্ষ স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটিতেছে না বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেইখানে বৃষ্টি কম হইতেছে এবং পলি জমিয়া কাপ্তাই হ্রদ ভরাট হইতেছে, সেইখানে চট্টগ্রামের ন্যায় একটি বৃহৎ নগরের বাসিন্দাদের প্রয়োজনের কথা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভাবিয়া দেখা উচিত। আমরা কামনা করি, এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কাপ্তাই হ্রদকে বাঁচানোর ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।



Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information
.design-developed a { text-decoration: none; color: #000000; font-weight: 700;

চট্টগ্রামে পানির সংকট

Update Time : ১২:১৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


লবণাক্ততার কারণে বিগত কয়েক বৎসর ধরিয়া প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সংগ্রহ করিতে পারিতেছে না চট্টগ্রাম ওয়াসা। হালদা ও কর্ণফুলী নদী হইতে পানি লইবার পর পরিশোধনের মাধ্যমে উহা নগরে সরবরাহ করিয়া থাকে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে সমুদ্রের পানি নদীতে ঢুকিয়া পড়িতেছে এবং সেই কারণে ওয়াসার পানিতে লবণের মাত্রাও ক্রমশ বাড়িতেছে। ফলে পানির উৎপাদন কমিয়া যাওয়ায় দিনের পরদিন পানি পাইতেছে না বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। আবার যেইটুকু পাইতেছে, লবণাক্ততার কারণে সেইটুকুও মুখে তুলিবার উপায় নাই। কর্তৃপক্ষ বিকল্প উপায়ের তালাশ করিতেছেন বটে; কিন্তু পানির সংকট বিশেষত রোজাব্রত মানুষের ভোগান্তি চরমভাবে বাড়াইয়া তুলিয়াছে। গত বৎসর রমজানেও একই চিত্র লক্ষ করা গিয়াছিল।

জানা যায়, পানি সংগ্রহের প্রশ্নে চট্টগ্রাম ওয়াসার একমাত্র ভরসা এই কাপ্তাই হ্রদ। এই হ্রদ হইতে পানি আসিয়া প্রথমে কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে পড়ে। তবে মুশকিল হইল, স্বাভাবিক অবস্থায় হ্রদে পানির স্তর ১০৯ ফুট পর্যন্ত থাকিলেও সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে তাহা ক্রমশ নামিয়া যাইতেছে। বিশেষ করিয়া, গ্রীষ্মের শুরুতে হ্রদের বিভিন্ন জায়গায় পানি কমিয়া যায়। ইহার ফলে নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, মৎস্য উৎপাদন ও পর্যটনে ক্ষতির পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন যেমন হ্রাস পায়, তেমনি তৈরি হয় ওয়াসার পানির সংকট। আর ইহার প্রভাব পড়ে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাপনে।

পানিতে অতিরিক্ত লবণের কারণে উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি কিডনি ও চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে—চিকিৎসকদের এমন আশঙ্কার মুখে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিকল্প স্থান হইতে পানি সংগ্রহ করিয়া সরবরাহ স্বাভাবিক রাখিবার জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ একটি নূতন পানি শোধনাগার প্রকল্প নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করিয়াছে, যাহা হইতে দৈনিক ৬৩ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করা যাইবে। শুষ্ক মৌসুমের সংকট কাটাইতে এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার নিরিখে ইহা সময়োপযোগী উদ্যোগ বটে। জানা যায়, ‘লবণাক্ততা পরিহারের লক্ষ্যে মোহরা পানি শোধনাগারের ইনটেক স্থানান্তর এবং উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ নামক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হইলে ২০৪২ সালে গিয়াও নগরীতে পানির বর্ধিত চাহিদা মিটানো সম্ভব হইবে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৯ সালে এই প্রকল্প শেষ করিবার লক্ষ্য ছিল ওয়াসার। তবে এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরুই করা যায় নাই। বিপদ বুঝিয়াও আগাম ব্যবস্থা গ্রহণে এই অনীহা কেন?

চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তাদের হিসাব মতে, বর্তমানে এই নগরীতে পানির দৈনিক চাহিদা ৫৮ কোটি লিটার, যাহা ২০৩২ সালে ৭৫ কোটি এবং ২০৪২ সালে ১০০ কোটি লিটার ছাড়াইয়া যাইবে। পানির এই বিশাল চাহিদা এবং তাহার বিপরীতে উদ্ভূত সংকট মিটাইতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ লওয়া হইবে বলিয়া জানাইয়াছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এমনকি লবণাক্ততার সমস্যা দ্রুত সমাধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জোয়ারের পানি আটকাইবার জন্য রেগুলেটর নির্মাণের প্রয়োজনের কথাও বলিতেছেন অনেকে। এখন প্রয়োজন কেবল এই সকল উদ্যোগের সফল ও ত্বরিত বাস্তবায়ন।

চিকিৎসকদের পরামর্শ হইল, খাওয়ার পানিতে সর্বোচ্চ ১৪৫ মিলিগ্রাম সোডিয়াম বা লবণ থাকা স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘদিন ধরিয়া ইহার অধিক পরিমাণে সোডিয়ামযুক্ত পানি পান ও ব্যবহার করিলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হইতে পারে। বিশেষ করিয়া, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা ইহাতে বেকায়দায় পড়িয়া যাইবেন। সুতরাং, কাপ্তাই হ্রদের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি আমলে লইয়া বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা অতি জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। প্রায় প্রতি বৎসরই লবণাক্ততার জন্য সীমাহীন ভোগান্তি পোহাইতে হইলেও কর্তৃপক্ষ স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটিতেছে না বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেইখানে বৃষ্টি কম হইতেছে এবং পলি জমিয়া কাপ্তাই হ্রদ ভরাট হইতেছে, সেইখানে চট্টগ্রামের ন্যায় একটি বৃহৎ নগরের বাসিন্দাদের প্রয়োজনের কথা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভাবিয়া দেখা উচিত। আমরা কামনা করি, এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কাপ্তাই হ্রদকে বাঁচানোর ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।